ভারতে চলমান বিক্ষোভের সঙ্গে বাংলাদেশ বা নেপালের সরকার পতনের তুলনা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন সিজেপি কর্মী অভিজিৎ দিপকে। জেলে বন্দি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার আন্দোলনকে তিনি সম্পূর্ণ অহিংস এবং গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহ বলে দাবি করেছেন।
ভারতে তরুণদের বিক্ষোভের সঙ্গে নেপাল বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পতনের তুলনা নিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। এর মাঝেই মঙ্গলবার এক্সে (X) একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) কর্মী অভিজিৎ দিপকে। স্থানীয় বিক্ষোভকে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সঙ্গে মেলানোর দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন দিপকে। জেলে বন্দি দুই কর্মী সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ওঁরা যেভাবে শান্ত থেকেছেন, সেটাই প্রমাণ করে যে এটা পুরোপুরি গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহ।
ফ্রান্স, নেপাল, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের আন্দোলনের তুলনা অভিজিৎ দিপকের
ফ্রান্সে তরুণদের দাঙ্গা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও নেপালের সরকার পতনের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা যারা বলছেন, সেইসব সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়েছেন দিপকে। তিনি বলেন, ভারতের ভিন্নমতাবলম্বীরা কতটা অহিংসার পথে চলছেন, সেটা সবার দেখা উচিত।
দিপকে বলেন, "যারা সারাক্ষণ আঙুল তুলে বলছেন, 'ফ্রান্সে কী হচ্ছে দেখুন...', তাদের একটু লজ্জা হওয়া উচিত। বরং ভারতে কী হচ্ছে সেদিকে তাকান। সৌরভ দাস আর আশুতোষ হাসিমুখে জেলে গেছেন। অন্য জায়গায় যা হচ্ছে, ওঁরা তেমন কিছুই করেননি। বেআইনিভাবে জেলে ঢোকানো হচ্ছে জেনেও ওঁরা শান্তি আর সহমর্মিতার পথই বেছে নিয়েছেন। মনে কোনও রাগ বা ঘৃণা না রেখে হাসিমুখেই জেলে ঢুকেছেন।"
দেশের ভেতরের এই নাগরিক আন্দোলনকে বিদেশের হিংসাত্মক অভ্যুত্থানের সঙ্গে মেলাতে নারাজ দিপকে। তাঁর মতে, বন্দি কর্মীদের আচরণই বিদেশের আন্দোলনের সঙ্গে ভারতের নাগরিক প্রতিরোধের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, "লোকে নেপাল বা বাংলাদেশের কথা বলে, কিন্তু আমাদের কমরেডদের দিকে একবার তাকান। কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে ওঁরা হাসিমুখে জেলে গেছেন। ওঁরা এখনও গান্ধীবাদী আদর্শ মেনেই চলছেন—জেলে যাওয়ার পথেও মুখে হাসি, আবার এজলাসের ভেতরেও মুখে হাসি। ওঁদের মনে আপনারা ঘৃণা ঢোকাতে পারবেন না, কারণ ঘৃণা তো আপনাদের মনে। আর আপনাদের এই ঘৃণা দেশটাকে আজ কোথায় নামিয়েছে, সেটা সবাই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।"
ককরোচদের আন্দোলনের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর সত্যগ্রহের তুলনা অভিজিৎ দিপকের
কর্মীদের এই কারাবাসকে কোনও বিশৃঙ্খল অভ্যুত্থানের হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন না দিপকে। বরং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে একে এক নৈতিক জাগরণ হিসেবেই তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর কথায়, "সরাসরি তুলনা টানতে চাই না, তবে মহাত্মা গান্ধী যা করেছিলেন, এটা তারই প্রতিফলন। যখন তাঁকে জেলে পাঠানো হয়েছিল, তিনি চুপচাপ চলে গিয়েছিলেন কারণ ওটাই ছিল তাঁর সত্যাগ্রহ। আশুতোষ আর সৌরভও ঠিক একই সত্যাগ্রহ পালন করছেন। জেলের ভেতরে ওই কষ্ট সহ্য করে ওঁরা আসলে এই দেশের বিবেককে জাগিয়ে তুলছেন। ওঁরা কবে ছাড়া পাবেন, আমি সেই অপেক্ষাতেই আছি।"
জমায়েতকে যারা আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের হুমকি হিসেবে দেখেন, সেইসব সরকারি প্রশাসন ও রাজনৈতিক বিরোধীদেরও বার্তা দিয়েছেন দিপকে। তিনি স্পষ্ট জানান, এভাবে আটকে রেখে বা জেলে পাঠিয়ে এই আন্দোলনের মনোবল ভাঙা যাবে না, আর একে হিংসার দিকেও ঠেলে দেওয়া যাবে না।
দিপকে বলেন, "কেউ যদি ভাবে সৌরভ আর আশুতোষকে আটকে রেখে ভয় দেখাবে বা ভেঙে দেবে, তবে সেটা কোনওদিন হবে না। আমি কথা দিচ্ছি, ওঁরা যখন বেরিয়ে আসবেন, তখন ওই একই হাসি নিয়ে 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' স্লোগান দিতে দিতেই বেরোবেন। মহাত্মা গান্ধীর দেখানো শান্তি আর অহিংসার পথেই ওঁরা চলবেন, যে আদর্শে আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি।"
সোমবার সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার প্রথম দফার পাঁচ দিনের জেল হেফাজতের মেয়াদ শেষ হয়। এরপর তাঁদের বিচার বিভাগীয় হেফাজতের মেয়াদ আরও দু'দিন বাড়ানো হয়েছে।
সৌরভ-আশুতোষদের জামিন নাকচ
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, নথিপত্রে গরমিল থাকার কারণে সৌরভ ও আশুতোষের জামিন নাকচ হয়ে যায়। এরপর দিল্লির মন্দির মার্গ থানা থেকে তাঁদের ফের জেল হেফাজতে পাঠানো হয়। মন্দির মার্গ থানায় অবস্থিত স্পেশাল এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট (এসইএম) আদালত আগামী ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের হেফাজতের মেয়াদ বাড়িয়েছে।
অন্যদিকে, গত ৯ অক্টোবর ফক্স নিউজ ডিজিটালের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন সামনে আসে। সেখানে ফ্রান্সের ছাত্র বিক্ষোভ এবং এর সমর্থকদের সঙ্গে যুক্ত ৫০টি সংগঠনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক এবং কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো স্কুলের পরিবেশ নিয়ে হওয়া এই বিক্ষোভকে নিজেদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে বিরোধীদের চলমান বিক্ষোভকে ফ্রান্স বা ইউরোপের অন্যান্য দেশের হিংসাত্মক নাগরিক অস্থিরতার সঙ্গে জোড়ার চেষ্টাকে কড়া ভাষায় খারিজ করেছে কংগ্রেস। দলের দাবি, বিরোধীদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ, সাংবিধানিক এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতেই সীমাবদ্ধ।
শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অভিযোগ করেছিল যে, বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মতো ভারতেও 'সরকার পতন' ঘটাতে "ভারত-বিরোধী চক্র" একজোট হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। বিজেপির এই দাবির পরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় কংগ্রেস।








