হুইস্কি, রাম ও ভদকার মধ্যে পার্থক্য কী? বেশিরভাগ লোকই না জেনে খান, আপনি জেনে নিন
Old Monk, McDowell’s No.1, Gold Reserve-এর মতো মদ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, খাদ্যপণ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI-এর বক্তব্য, বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু জনপ্রিয় পানীয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আসলে ‘রাম’ বা ‘হুইস্কি’ হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে।

ভারতে বহুল জনপ্রিয় Old Monk, McDowell’s No.1, Gold Reserve-এর মতো মদ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ, খাদ্যপণ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থা FSSAI-এর বক্তব্য, বাজারে বিক্রি হওয়া কিছু জনপ্রিয় পানীয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আসলে ‘রাম’ বা ‘হুইস্কি’ হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে। বিষয়টি সামনে এসেছে Old Monk-কে ঘিরে আইনি বিতর্কের পর। FSSAI বম্বে হাই কোর্টে জানিয়েছে, Old Monk-এ মূলত নিউট্রাল স্পিরিট বা Extra Neutral Alcohol (ENA) ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার সঙ্গে রামের কৃত্রিম ফ্লেভার মেশানো হয়েছে। ফলে এটিকে সরাসরি ‘রাম’ হিসেবে বিক্রি করা নিয়ে আপত্তি রয়েছে।

অ্যালকোহলের শ্রেণিবিভাগ তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে: কৃষিভিত্তিক কাঁচামাল, পাতন পদ্ধতি এবং পরিপক্কতার প্রক্রিয়া। সাধারণত, স্পিরিট বলতে এমন অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়কে বোঝানো হয় যা ফল, শস্য বা গুড় গাঁজিয়ে এবং তারপর পাতন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়। স্পিরিটে কোনও চিনি বা মিষ্টিজাতীয় পদার্থ থাকে না এবং এগুলি সাধারণত উচ্চ অ্যালকোহলযুক্ত (ABV) পানীয়। সমস্ত লিকারই স্পিরিট থেকে উদ্ভূত, কিন্তু এর বিপরীতটি সত্য নয়। আসলে রাম ও হুইস্কি কীভাবে তৈরি হওয়ার কথা? আর ভারতের 'ইন্ডিয়ান ফরেন মেড লিকার' (IMFL) বা ভারতীয় বিদেশি ধাঁচের মদ শিল্প কেন আলাদা? আসুন জেনে নেওয়া যাক।
হুইস্কি: ঐতিহ্যগতভাবে, বার্লি, ভুট্টা, রাই এবং গমের মতো শস্যের মিশ্রণ (ম্যাশ) থেকে হুইস্কি তৈরি করা হয়; এই শস্যগুলো এককভাবে বা বিভিন্ন অনুপাতে মিশ্রিত করে ব্যবহার করা যেতে পারে। শস্যের এই মিশ্রণটিকে প্রথমে মল্টিং (অঙ্কুরোদগম ও শুকানোর প্রক্রিয়া) ও গাঁজন (ফার্মেন্টেশন) করা হয় এবং এরপর পাতন (ডিস্টিলেশন) প্রক্রিয়ায় অপেক্ষাকৃত কম অ্যালকোহল ঘনত্বের মাত্রায় নিয়ে আসা হয়, যাতে পানীয়টিতে শস্যের নিজস্ব প্রাকৃতিক স্বাদ বজায় থাকে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, হুইস্কি অবশ্যই ওক কাঠের পাত্রে সংরক্ষণ ও পরিপক্ব (এজিং) করতে হবে। এই পরিপক্বকরণ প্রক্রিয়াই পানীয়টিকে তার বিশেষ অ্যাম্বার বা ঈষৎ-লালচে বাদামী রঙ, সুবাস এবং নিজস্ব স্বাদ প্রদান করে। ভারত বিশ্বের বৃহত্তম হুইস্কি ভোক্তা দেশ। তবে আমরা যা পান করছি তা আদৌ হুইস্কি কি না, সে বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করব।
ব্র্যান্ডি: ওয়াইন বা গাঁজানো ফলের রস পাতন করে এই পানীয়টি তৈরি করা হয়। যদিও আঙুরই এর প্রধান উপাদান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তবুও আপেল বা প্লাম (আলুবোখারা) ব্যবহার করেও এর বিভিন্ন সংস্করণ তৈরি করা সম্ভব। পাতন প্রক্রিয়ার পর সাধারণত ওক কাঠের ব্যারেলে রেখে এটিকে পরিপক্ব করা হয়। এতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম থাকে।
টাকিলা: টাকিলা এবং এর বৃহত্তর শ্রেণিভুক্ত 'অ্যাগেভ স্পিরিট' মূলত অ্যাগেভ উদ্ভিদের গাঁজানো রস পাতন করেই তৈরি করা হয়। কাঁটাযুক্ত এই উদ্ভিদটি উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলে ভালো জন্মে এবং মূলত আমেরিকা মহাদেশে পাওয়া যায়; এর উৎপাদনে মেক্সিকোই সবচেয়ে এগিয়ে। এটি কঠোর ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) আইনের আওতাভুক্ত। খাঁটি টাকিলা অবশ্যই মেক্সিকোর নির্দিষ্ট অঞ্চলে জন্মানো 'ব্লু অ্যাগেভ' উদ্ভিদ থেকে তৈরি হতে হবে।
রাম: রাম মূলত আখ, আখের গাঁজানো রস, চিটাগুড় (আখ থেকে চিনি তৈরির সময় অবশিষ্ট ঘন ও গাঢ় সিরাপ) বা অন্যান্য উপজাত দ্রব্য থেকে তৈরি করা হয়। এর বিশেষ স্বাদ ও সুবাস প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠে বলে আশা করা হয়। অধিকাংশ রাম কাঠের পিপায় রেখে পরিপক্ব করা হয়, যা এর স্বাদকে আরও সুষম ও পূর্ণতা দেয়।
ভদকা এবং জিন: এগুলোকে 'নিউট্রাল স্পিরিট' বা নিরপেক্ষ পানীয় হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। শস্য বা আলুর মতো উপাদান থেকে ভদকা পাতন করা হয় এবং একে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার বিশুদ্ধতায় (উচ্চ ABV-তে) উন্নীত করা হয়। ভদকা তৈরির সময় এমনভাবে তীব্র পাতন প্রক্রিয়া চালানো হয় যাতে তরলটি থেকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সুবাস, স্বাদ ও রঙ দূর হয়ে যায়; এর ফলে একটি বিশুদ্ধ ও পরিপক্বকরণ-বিহীন পানীয় পাওয়া যায়। জিন তৈরির ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিরপেক্ষ ভিত্তি ব্যবহার করা হলেও এটি একটি স্বতন্ত্র শ্রেণিতে পড়ে। এর কারণ হল পাতন প্রক্রিয়ার পরে জুনিপার বেরি-র মতো বিভিন্ন ভেষজ উপাদান বা 'বোটানিক্যালস' ব্যবহারের মাধ্যমে এর বিশেষ স্বাদ তৈরি করা হয়।