২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণ মামলায় ১১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে NIA-এর দেওয়া সাড়ে ৭ হাজার পাতার চার্জশিট গ্রহণ করল বিশেষ আদালত। অভিযুক্তরা আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত এবং এক বড় জিহাদি ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল বলে অভিযোগ।
শনিবার দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউয়ের এক বিশেষ NIA আদালত লালকেল্লা বিস্ফোরণ মামলায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা NIA-এর দেওয়া চার্জশিট গ্রহণ করেছে। এই মামলায় NIA প্রথমে ১২ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছিল। তাদের মধ্যে উমর উন নবি নামে এক অভিযুক্ত বিস্ফোরণেই মারা যায়, আর একজন পলাতক। পরে আরও দুজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একটি সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটও জমা দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের নভেম্বরে দিল্লির লালকেল্লার কাছে একটি গাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সেই মামলাতেই NIA একাধিক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছে।
আদালত চার্জশিট গ্রহণ করল
বিশেষ NIA আদালতের বিচারপতি প্রশান্ত শর্মা সমস্ত অভিযুক্তের বিরুদ্ধেই চার্জশিট গ্রহণ করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে ৯ সেপ্টেম্বর। আদালত NIA-কে চার্জশিটের কপি অভিযুক্তদের সরবরাহ করতে বলেছে।
NIA মোট ১১ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাড়ে সাত হাজার পাতার এক বিশাল চার্জশিট জমা দিয়েছে। এই চার্জশিটে ৫৮৮ জনকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। NIA-এর পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (SPP) মাধব খুরানা, ত্রিশা মিত্তল এবং পাবলিক প্রসিকিউটর অনিল দাবাস। তাঁরা জানান, প্রথম চার্জশিট ১৪ মে এবং সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট ২৬ জুন, ২০২৬-এ জমা দেওয়া হয়। অভিযুক্ত আমির রশিদ মীর, জাসির বিলাল ওয়ানি, ডঃ মুজামিল শাকিল, ডঃ আদিল আহমেদ রাঠের, ডঃ শাহীন সঈদ, মুফতি ইরফান আহমদ ওয়াগে, সোয়াব, ডঃ বিলাল নাসির মাল্লা এবং ইয়াসির আহমদ দারকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আদালতে পেশ করা হয়।
বিস্ফোরণ ও অভিযুক্তদের পরিচয়
২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লার কাছে এই বিস্ফোরণ ঘটে। NIA-এর তথ্য অনুযায়ী, গাড়িতে রাখা শক্তিশালী ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (VBIED) বিস্ফোরণে ১১ জনের মৃত্যু হয় এবং অনেকে আহত হন। আশেপাশের সম্পত্তিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তদন্তকারী সংস্থা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে UAPA, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, বিস্ফোরক পদার্থ আইন, অস্ত্র আইন এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর প্রতিরোধ আইনের মতো কড়া ধারায় মামলা করেছে। মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত ডঃ উমর উন নবির বিস্ফোরণে মৃত্যু হওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা বাতিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাকি অভিযুক্তরা হল— আমির রশিদ মীর, জাসির বিলাল ওয়ানি, ডঃ মুজামিল শাকিল, ডঃ আদিল আহমেদ রাঠের, ডঃ শাহীন সঈদ, মুফতি ইরফান আহমদ ওয়াগে, সোয়াব, ডঃ বিলাল নাসির মাল্লা এবং ইয়াসির আহমদ দার।
বিরাট 'জিহাদি ষড়যন্ত্রের' পর্দাফাঁস
NIA-এর দাবি, সব অভিযুক্তই আনসার গজওয়াত-উল-হিন্দ (AGuH) গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। এটি আল-কায়দা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর একটি শাখা, যাকে ২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। জম্মু ও কাশ্মীর, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং দিল্লি-এনসিআর জুড়ে ব্যাপক তদন্তের পর এই চার্জশিট তৈরি করা হয়েছে। এতে ৫৮৮ জনের মৌখিক সাক্ষ্য, ৩৯৫টির বেশি নথি এবং ২০০টির বেশি বাজেয়াপ্ত করা জিনিসপত্রের প্রমাণ রয়েছে।
NIA জানিয়েছে, এর পিছনে রয়েছে এক বিরাট "জিহাদি ষড়যন্ত্র"। AQIS/AGuH-এর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ডাক্তারদের মতো শিক্ষিত ব্যক্তিরাও এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, ২০২২ সালে শ্রীনগরে একটি গোপন বৈঠকে অভিযুক্তরা "AGuH অন্তর্বর্তী" নামে সংগঠনটিকে নতুন করে সাজিয়েছিল।
অপারেশন হেভেনলি হিন্দ
সংস্থার আরও অভিযোগ, অভিযুক্তরা 'অপারেশন হেভেনলি হিন্দ' নামে একটি অভিযান শুরু করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে শরিয়া আইন চালু করা। তদন্তকারী সংস্থার মতে, অভিযুক্তরা সদস্য নিয়োগ, চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার, অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুত এবং সাধারণ রাসায়নিক ব্যবহার করে বিস্ফোরক তৈরির কাজ করছিল।
তদন্ত ও ফরেনসিক প্রমাণ
NIA-এর দাবি, বিস্ফোরণে ট্রাইঅ্যাসিটোন ট্রাইপারক্সাইড (TATP) নামে বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একাধিক পরীক্ষার পর তৈরি করা হয়। তদন্তে AK-47 রাইফেল, ক্রিঙ্কভ রাইফেল এবং দেশি পিস্তলের মতো নিষিদ্ধ অস্ত্র বেআইনিভাবে সংগ্রহের প্রমাণও মিলেছে। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীকে নিশানা করতে রকেট-ভিত্তিক এবং ড্রোন-মাউন্টেড IED নিয়েও তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছিল।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং এবং ভয়েস অ্যানালিসিসের মতো বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত অভিযুক্ত ডঃ উমর উন নবির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে।


