অপারেশন সিঁদুরের সময় এস-৪০০ (S-400) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জিতেন্দ্র মিশ্র জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের মে মাসে চলা সংঘাতের সময় এই এস-৪০০-র অবস্থান শনাক্ত করতে পাকিস্তান এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে তারা ভারতের অভ্যন্তরে গুপ্তচর ও 'স্লিপার সেল' সক্রিয় করেছিল।
অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলায় এস-৪০০ (S-400) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল জিতেন্দ্র মিশ্র জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের মে মাসে চলা সংঘাতের সময় এই এস-৪০০-র অবস্থান শনাক্ত করতে পাকিস্তান এতটাই মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে তারা ভারতের অভ্যন্তরে গুপ্তচর ও 'স্লিপার সেল' সক্রিয় করেছিল। 'অপারেশন সিঁদুর'-এর সময় ওয়েস্টার্ন এয়ার কমান্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মিশ্র এএনআই (ANI)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এস-৪০০ সিস্টেমের উপস্থিতির কারণে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো ভারতীয় সীমান্তের ২০০ কিলোমিটারের মধ্যেও আসতে পারেনি।
'সর্বোত্তম যুদ্ধ সেবা পদক'-এ ভূষিত এয়ার মার্শাল মিশ্র 'অপারেশন সিঁদুর' সম্পর্কে যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বিস্তারিত। তাঁর মতে, সংঘাত চলাকালীন রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ সিস্টেমটিই পাকিস্তানের কাছে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মিশ্র জানান, এর ফলে পাকিস্তানকে তাদের সমস্ত কৌশল ও উপায় প্রয়োগ করতে হয়েছিল।
'এস-৪০০ হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি'
এয়ার মার্শাল বলেন, "এস-৪০০ সিস্টেম কোথায় মোতায়েন করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করতে পাকিস্তানিরা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তারা সম্ভাব্য সব উপায়ই কাজে লাগিয়েছিল। এমনকি তারা অন্যান্য দেশের কাছ থেকে স্যাটেলাইট সংক্রান্ত সহায়তাও পাচ্ছিল।" যদিও মিশ্র নির্দিষ্ট কোনও দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে সেনাবাহিনীর একজন কর্তা আগেই নিশ্চিত করেছিলেন যে চিন রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছিল পাকিস্তানকে।
এয়ার মার্শাল আরও জানান, "প্রতিবারই যখন তারা (পাকিস্তান) আকাশে উড়ত, তখনই এস-৪০০-এর আক্রমণের শিকার হতো। তাদের কাছে এস-৪০০ ছিল সবচেয়ে বড় হুমকি। এস-৪০০-এর অবস্থান জানার জন্য তারা ভারতের ভেতরে গুপ্তচর ও স্লিপার সেলও সক্রিয় করেছিল।"
ভারতের 'সুদর্শন চক্র' হিসেবে পরিচিত এস-৪০০ হল একটি ভূমি-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, যা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উন্নত রাডার থাকায় এস-৪০০ অনেক দূর থেকেই আকাশপথের হুমকি শনাক্ত করে তা ধ্বংস করতে পারে। ২০১৮ সালে ভারত ও রাশিয়া পাঁচটি এস-৪০০ সিস্টেম কেনার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এর মধ্যে তিনটি সিস্টেম ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে এবং ভারতীয় বিমানবাহিনীতে (IAF) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থ স্কোয়াড্রনটি চলতি বছরের জুন মাসে হাতে পাওয়া গেছে।
'সেনাবাহিনীর উপর কোনও বিধিনিষেধই ছিল না'
পহেলগাঁও সন্ত্রাসবাদী হামলার জবাবে ভারত 'অপারেশন সিঁদুর' শুরু করেছিল। এয়ার মার্শাল জানান, সেনাবাহিনীকে "অপারেশনাল স্বাধীনতা" বা অভিযানের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ ছিল যেন সাধারণ মানুষের কোনও ক্ষতি না হয়। জিতেন্দ্র মিশ্র বলেন, "নির্দেশ ছিল যেন কোনও পার্শ্ব-ক্ষতি (collateral damage) না হয়। আমরা চাইনি সাধারণ নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হোক। কেবল সন্ত্রাসবাদী এবং তাদের মদতদাতাদেরই শাস্তি দেওয়া হবে—এমনটাই ছিল লক্ষ্য। আমরা যুদ্ধপ্রিয় কোনও রাষ্ট্র নই।" একই সুরে তিনি আরও বলেন, "কোনও বিধিনিষেধই ছিল না। যুদ্ধ কীভাবে চালানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার সেনাবাহিনীর উপরেই ছাড়া হয়েছিল।" এই মন্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিরোধী দল বারবার অভিযোগ করে এসেছে যে সরকার সশস্ত্র বাহিনীর হাত বেঁধে রেখেছিল। মিশ্র জানান, ৭ মে ভারত যখন জইশ ও লস্করের ঘাঁটি-সহ মোট নয়টি আস্তানায় আঘাত হানে, তখনই বিষয়টি শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু পাকিস্তান সংঘাত আরও বাড়িয়ে তোলার পথ বেছে নেয়। পাকিস্তান শুরুতে আদমপুর বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ১৪-১৫টি ড্রোন পাঠিয়েছিল। তবে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়। এরপর ৯ মে পাকিস্তান শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
মিশ্র জানান, দূরপাল্লার ও জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত একটি ড্রোন বিমানঘাঁটির ভেতরে থাকা একটি হাসপাতাল এবং তার পাশেই অবস্থিত একটি অসামরিক কার্যালয়ে আঘাত হানে। তিনি বলেন, "আমরা একজন বিমানসেনাকে হারিয়েছি এবং আরেকজনের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল (অ্যাম্পুটেশন করতে হয়েছিল)। তাঁরা দুজনেই ছিলেন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট।"
পাকিস্তানি বাহিনী অসামরিক এলাকা এবং গুরুদুয়ারা-সহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়কেও টার্গেট করার চেষ্টা করেছিল। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ভারত আর চুপ করে বসে থাকবে না এবং পাল্টা জবাব দেবে।
পাকিস্তান কীভাবে অন্ধ ও অচল হয়ে পড়েছিল?
মিশ্র জানান, ভারতীয় বিমানবাহিনী (IAF) প্রথমেই পাকিস্তানের স্থল-ভিত্তিক রাডার এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারগুলোকে ধ্বংস করে তাদের আকাশপথে অভিযানের সক্ষমতা ও সমন্বয় ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। তিনি বলেন, "আমরা তাদের সব রাডার ধ্বংস করেছিলাম, যার মধ্যে পাঞ্জাব সীমান্তে থাকা আমেরিকান এএন/টিপিএস (AN/TPS) সিরিজের রাডারগুলোও ছিল। এছাড়া আমরা তাদের দুটি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টারও ধ্বংস করি। ফলে তারা কার্যত অন্ধ হয়ে পড়েছিল।"
স্থল-ভিত্তিক রাডারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী আকাশ-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম বা 'অ্যাওয়াকস' (AWACS)-এর উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সরগোধা থেকে একটি অ্যাওয়াকস বিমান মোতায়েন করা হলেও এস-৪০০ (S-400) ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সেটিকে ধ্বংস করা হয়। মিশ্র বলেন, "আকাশপথে থাকা রাডারের মাধ্যমেই কেবল লক্ষ্যবস্তুটিকে দেখা সম্ভব ছিল। আমার এস-৪০০ (S-400) অপারেটর আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে গুলি চালাতে পারবে কি না। আমি বললাম, চালাও। আর সে যখন গুলি চালাল, তখন ৩১৪ কিলোমিটার দূর থেকেই আমরা লক্ষ্যবস্তুটিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হলাম। সামরিক ইতিহাসে এটিই ছিল ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে সবচেয়ে দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসের ঘটনা। এই ঘটনাটি মূলত সংঘাতের ভারসাম্যই বদলে দিয়েছিল। পাকিস্তানের যে কোনও স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল ভারত এবং পাকিস্তানের কিছুই করার ছিল না।"
পাকিস্তানের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষার দিনটি ছিল ১০ মে। সেদিন ভারত ১১টি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানে, যার মধ্যে নূর খান ও ভোলারির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এবং তিন দিন ধরে চলা তীব্র সংঘাতের অবসান ঘটে। ওয়েস্টার্ন কমান্ডের প্রাক্তন এই প্রধান আরও জানান যে, এই অভিযানে মহিলা যুদ্ধবিমান চালকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং একাধিক মিশনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁরা লস্কর-এ-তইবার (LeT) মুরিদকে সদর দফতরে আঘাত হেনেছিলেন এবং একই পাইলটরা ফিরে গিয়ে বিমানঘাঁটি ও কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারগুলোতেও আঘাত করেছিলেন।


