বিশকেকে SCO প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে রাজনাথ সিং এক নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে সওয়াল করেন। তিনি জোরের বদলে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিশ্বকে শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগে রাখতে হবে। 'নতুন বিশ্বব্যবস্থা'র প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং মঙ্গলবার জোর দিয়ে বলেছেন, বলপ্রয়োগের বদলে নিয়ম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা মেনে চলা উচিত। তাঁর মতে, বর্তমান যুগকে হিংসা বা যুদ্ধের যুগ না বানিয়ে, "শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ" হিসেবে নিশ্চিত করাটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
বিশ্ব স্থিতিশীলতায় SCO-র ভূমিকা
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের বৈঠকে রাজনাথ সিং সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, "যেহেতু SCO বিশ্বের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই শুধু আমাদের অঞ্চলে নয়, গোটা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।"
বর্তমানে SCO-র সদস্য দেশগুলো হলো ভারত, রাশিয়া, চিন, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান এবং বেলারুশ। ২০০১ সালে রাশিয়া, চিন এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে এই গোষ্ঠীটি তৈরি হয়েছিল। গত কুড়ি বছরে এটি একটি অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে পূর্ণ সদস্য হওয়ার পর থেকে ভারত এই ব্লকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৩ সালে ভারত এর সভাপতিত্বও করে। গত বছর ভারতের সভাপতিত্বেই ইরানকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা এই সংগঠনের কৌশলগত প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আলোচনা ও কূটনীতির ডাক
এই প্রভাবশালী মঞ্চ থেকে আগ্রাসনের পথ থেকে সরে আসার আহ্বান জানান রাজনাথ। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত মেটানোর ওপর জোর দেন। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের আলোচনা ও কূটনীতির পথেই চলা উচিত, বলপ্রয়োগের পথে নয়। এই যুগকে হিংসা ও যুদ্ধের যুগ হতে দেওয়া উচিত নয়, বরং শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ বানানো উচিত।" তিনি আরও বলেন, "মহাত্মা গান্ধীর সেই বার্তাটি আমি মনে করাতে চাই যে, চোখের বদলে চোখ নিলে সবাই অন্ধ হয়ে যাবে। আর যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত যে সেই কাজটি কীভাবে গরিব ও দুঃস্থ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে।"
'নতুন বিশ্বব্যবস্থা' নিয়ে প্রশ্ন
আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে যে বিশ্বজুড়ে চর্চা চলছে, সেই প্রসঙ্গেও কথা বলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি বর্তমান কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। রাজনাথের কথায়, "আমরা প্রায়ই একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার (new world order) কথা শুনি। কিন্তু আমাদের কি একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা দরকার, নাকি এমন একটি বিশ্ব দরকার যা আরও সুশৃঙ্খল (more orderly)?" তিনি যোগ করেন, আসল প্রয়োজন হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে "মর্যাদা ও সম্মানের" সঙ্গে দেখা হবে।
প্রতিষ্ঠিত নিয়মের অবক্ষয়
রাজনাথ সিং উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের অবক্ষয়। তিনি বলেন, "আজকের আসল সংকট কোনো কাল্পনিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি নয়, বরং প্রতিষ্ঠিত নিয়ম-ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার প্রবণতা।" তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে স্থিতিশীলতা এমন একটি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে যেখানে "মতপার্থক্য যেন বিবাদে পরিণত না হয়, এবং বিবাদ যেন বিপর্যয়ের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।"
একজোট হয়ে মানবিকতার পথে হাঁটার ডাক
এইসব বিশ্বজোড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একজোট হওয়ার ডাক দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি SCO সদস্য দেশগুলোকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। রাজনাথ সিং বলেন, "আমাদের এমন একটি বৈশ্বিক ঐকমত্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে যেখানে বিশৃঙ্খলা, প্রতিযোগিতা এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহাবস্থান, সহযোগিতা এবং সহানুভূতি প্রাধান্য পাবে।" এর মাধ্যমে তিনি একটি স্থিতিশীল ও সহযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশের পক্ষে ভারতের অবস্থান ফের স্পষ্ট করেন।

