ত্বিষা শর্মা মামলায় কি প্রধান প্রমাণ 'লিগেচার' বা ফাঁস লাগানোর দড়িটি সঠিক ভাবে শনাক্ত না করেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল? বাজেয়াপ্ত করার মেমোতে কেন শনাক্তকারীর নাম নেই? তদন্তকারী অফিসারের গাড়িতে প্রমাণ রাখায় কি তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? সবচেয়ে বড় রহস্য হল, পুলিশের গোপন কেস ডায়েরির নথি অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছল কীভাবে?

ভোপাল: গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া হাই-প্রোফাইল ত্বিষা শর্মা মৃত্যু মামলায় এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে, যা সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (CBI) তদন্তের মধ্যেই বেশ কিছু নতুন প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আদালতে পেশ করা সাম্প্রতিক নথি অনুযায়ী, ত্বিষার মৃত্যুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রধান প্রমাণ, অর্থাৎ 'লিগেচার' (ফাঁস লাগানোর দড়ি) বাজেয়াপ্ত করা এবং তা সামলানোর পদ্ধতিতে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। অভিযোগকারী পক্ষের এই দাবি মধ্যপ্রদেশের প্রশাসনিক ও পুলিশ মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: কে শনাক্ত করেছিল সেই ফাঁস?

এই পুরো মামলায় প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে ফাঁস লাগানোর দড়িটি শনাক্ত করা নিয়ে। আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৩ মে সকাল ৯:৪২ মিনিটে সাব-ইন্সপেক্টর দীনেশ শর্মা ঘটনাস্থল থেকে সেই দড়ি বা লিগেচারটি বাজেয়াপ্ত করেন, যা দিয়ে আত্মহত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আশ্চর্যের বিষয় হল, পুলিশের তৈরি করা 'সিজার মেমো'-তে এমন কোনও ব্যক্তির নামই উল্লেখ নেই যিনি দড়িটিকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। অভিযোগকারী পক্ষের স্পষ্ট যুক্তি, বাজেয়াপ্ত করার সময় ত্বিষার শাশুড়ি (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গিরিবালা সিং) বা তাঁর স্বামী সমর্থ সিং কেউই সেটিকে শনাক্ত করেননি। এমন পরিস্থিতিতে, কোনও সাক্ষী বা শনাক্তকারী ছাড়া ওই ফাঁসকে কীভাবে প্রধান প্রমাণ হিসেবে মেনে নেওয়া হল, এই পদ্ধতিটি পুরো তদন্তকেই সন্দেহের নজরে ফেলছে।

গাড়িতেই ঘুরছিল প্রধান প্রমাণ: প্রমাণের হেফাজত নিয়ে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ?

রহস্য শুধু শনাক্তকরণেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রমাণ সুরক্ষিত রাখার পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আদালতের নথিতে করা দাবি অনুযায়ী, বাজেয়াপ্ত করার পর ওই ফাঁসটি কোনও সুরক্ষিত মালখানায় না রেখে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তকারী অফিসারের ব্যক্তিগত গাড়িতেই রাখা ছিল। ভোপালের AIIMS-এ পাঠানোর আগে যেভাবে সেটিকে সামলানো হয়েছে, তাতে প্রমাণের সঙ্গে কারচুপি (Tampering) হওয়ার আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে কী ছিল?

প্রথম পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, ত্বিষা শর্মাকে বাড়ির ছাদে জিমন্যাস্টিক রিংয়ের দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। চিকিৎসকরা গলায় দুটি লাল দাগের উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন যে, ফাঁসির কারণেই মৃত্যু হয়েছে। তবে রিপোর্টে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঁচড় ও আঘাতের মতো একাধিক সাধারণ চোটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। এই কারণেই মামলার প্রতিটি প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই গাফিলতি আরও সংবেদনশীল কারণ পোস্টমর্টেম রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে ত্বিষার মৃত্যু "লিগেচার দিয়ে ফাঁসি লাগানোর (অ্যান্টিমর্টেম হ্যাঙ্গিং)" কারণে হয়েছে।

গোপন কেস ডায়েরি ফাঁস: অভিযুক্তরা কি ভেতর থেকে খবর পাচ্ছিল?

এই মামলায় সবচেয়ে চমকপ্রদ মোড় আসে যখন অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করে যে, যে সিজার মেমো আইনত গোপন 'কেস ডায়েরি'-র অংশ হওয়া উচিত ছিল, তা আগাম জামিনের আবেদনের সময় অভিযুক্ত পক্ষের কাছে ছিল। ২৭ মে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে গিরিবালা সিংয়ের দাখিল করা জবাবে এই গোপন নথিটি সংযুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, তদন্তের সামগ্রী এভাবে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে যাওয়া এটাই প্রমাণ করে যে সিস্টেমের ভেতরেই কেউ পর্দা আড়াল থেকে অভিযুক্তদের সাহায্য করছে। যদিও এই সব দাবির ওপর এখনও কোনও আদালতের চূড়ান্ত রায় আসা বাকি।

ডামি রিক্রিয়েশন ও বিচারবিভাগীয় হেফাজত: এরপর কী?

এই বাড়তে থাকা অসঙ্গতির মধ্যেই সিবিআই তাদের তদন্তের গতি বাড়িয়েছে। ১ জুন সিবিআই-এর একটি দল ভোপালের কাটারা হিলসের সেই বাড়িতে পৌঁছে পুরো ক্রাইম সিনের পুনর্নির্মাণ (Recreation) করে। দলটি ত্বিষার ওজনের সমান একটি ডামি জিমন্যাস্টিক রিংয়ের সেই দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে পরীক্ষা করে দেখে যে, আদৌ আত্মহত্যা সম্ভব ছিল কিনা। এর ঠিক পরের দিনই ভোপালের একটি আদালত স্বামী সমর্থ সিং এবং শাশুড়ি গিরিবালা সিংকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে জেলে পাঠিয়েছে।

প্রতিটি মিনিটের হিসেব খুঁজছে সিবিআই

এই বিতর্কের মাঝে সিবিআই মামলার গভীর তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে ডামির সাহায্যে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করেছে এবং ১২ মে রাতের মিনিট-প্রতি-মিনিট টাইমলাইন তৈরি করার চেষ্টা করছে। তদন্তকারী সংস্থা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক রিপোর্ট, দ্বিতীয় পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করছে। আপাতত আদালত সমর্থ সিং এবং গিরিবালা সিংকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়েছে।

রহস্য এখনও বাকি...

ত্বিষা শর্মার মৃত্যু কি আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও গল্প লুকিয়ে আছে—তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও মেলেনি। কিন্তু অভিযুক্তের ফাঁস, তার হেফাজত এবং নথিভুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো তদন্তকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন সকলের নজর সিবিআই-এর চূড়ান্ত রিপোর্ট এবং ফরেনসিক তথ্যের দিকে, যা এই হাই-প্রোফাইল মামলার সবচেয়ে বড় রহস্য থেকে পর্দা সরাতে পারে।