বাংলাদেশে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সঙ্কট। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও তিন ঘণ্টা, কোথাও আবার ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে শিল্প, ব্যবসা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পরিষেবাতেও। এর মধ্যেই ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশে ভয়াবহ বিদ্যুৎ সঙ্কট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। কোথাও তিন ঘণ্টা, কোথাও আবার ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে শিল্প, ব্যবসা থেকে শুরু করে হাসপাতাল পরিষেবাতেও। এর মধ্যেই ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি বর্তমানে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ২০২২ সালে যে ঘাটতি ছিল প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট, তার তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। দেশের একাধিক জেলায় প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

গোড্ডা প্ল্যান্ট বন্ধ নিয়ে কী অভিযোগ BNP-র?

ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় আদানি পাওয়ারের ১,৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট ১০ সেপ্টেম্বর রাতে বয়লারে সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে ওই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। ১৩ সেপ্টেম্বর ইউনিটটি ফের গ্রিডে যুক্ত হয়। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের BRICS সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করেছেন BNP-র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি। তাঁর অভিযোগ, তারেক রহমান দিল্লির BRICS সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরের দিনই আদানি প্ল্যান্টের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়।

রিজভির দাবি, গোড্ডা প্ল্যান্ট থেকে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ যায় এবং যেহেতু কেন্দ্রটি ভারতে, তাই ভারত চাইলে সেটি বন্ধ বা চালু করতে পারে। তবে এই দাবির পক্ষে তিনি কোনও প্রমাণ দেননি। আদানি প্ল্যান্টের ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে এখনও পর্যন্ত বয়লার সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত সমস্যার কথাই সামনে এসেছে।

শুধু আদানি প্ল্যান্ট নয়, গ্যাসের ঘাটতিও বড় সমস্যা

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সঙ্কটের পিছনে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা নেই। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে এসেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে LNG-সহ আমদানি করা গ্যাসের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে একসঙ্গে একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্রিডে।

কমছে দেশীয় গ্যাস, বাড়ছে আমদানির নির্ভরতা

বাংলাদেশের গ্যাস সঙ্কটের একটি বড় কারণ দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া। ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে দেশের গ্যাস উত্তোলন ছিল প্রায় ২৭.২ বিলিয়ন ঘনমিটার। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তা কমে প্রায় ১৯.৬ বিলিয়ন ঘনমিটারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা LNG সরবরাহে কোনও সমস্যা হলেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ছে।

২০২২ সালেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সময় বাংলাদেশ গ্যাস আমদানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল বিদ্যুৎ উৎপাদনে। এবার সেই সঙ্কট আরও বড় আকার নিয়েছে।

হাসপাতালেও অন্ধকার, টর্চ জ্বালিয়ে কাজ নার্সদের

বিদ্যুৎ সঙ্কটের ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে হাসপাতালগুলির পরিস্থিতি থেকেও। বরিশাল জেনারেল হাসপাতালে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পাশাপাশি ডিজেলচালিত জেনারেটরের জ্বালানিও ফুরিয়ে যায় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হাসপাতালের নার্সদের মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে রোগীদের পরিষেবা দিতে হয়েছে। রোগীদেরও হাতপাখা ব্যবহার করতে হয়েছে গরমের মধ্যে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্প সংস্থাগুলিও সমস্যায় পড়েছে। উৎপাদন কমছে, কোথাও ডিজেল বা LPG-র মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ভারতের বিদ্যুৎ কি এখনই বড় ভরসা হতে পারে?

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনাও সীমিত। কারণ বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ভারত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানি করে। তার মধ্যে আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্রের সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গোড্ডা কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রযুক্তিগত সমস্যা হলেও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তার বড় প্রভাব পড়তে পারে। এর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান টানাপোড়েনও পরিস্থিতিকে আরও রাজনৈতিক করে তুলেছে। বিশেষ করে BRICS সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের না যাওয়াকে কেন্দ্র করে BNP নেতা রিজভির মন্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

BRICS নিয়ে বিতর্ক কোথায়?

তারেক রহমানের BRICS সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন রিজভি। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কোনও সম্মেলনে গিয়ে পাশে বসে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানানো গ্রহণযোগ্য নয়।

অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দু'বার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি আমন্ত্রণ ছিল দ্বিপাক্ষিক স্তরে এবং অন্যটি ছিল BRICS-এর Outreach অধিবেশনের জন্য। বাংলাদেশ তখন BIMSTEC-এর চেয়ার হিসেবে ওই Outreach অধিবেশনে আমন্ত্রিত হয়েছিল।