রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় দাঁড়িয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গোটা বিশ্বকে সতর্ক করলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। পাশাপাশি, সাম্প্রতিক বিপর্যয়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভারত ও চিনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ সভায় (UNGA) ভাষণ দেওয়ার সময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গোটা বিশ্বকে একজোট হওয়ার ডাক দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি নেপাল, ভারত ও চিনের নেতৃত্বে একটি 'হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম' বা হিমালয় জলবায়ু মোকাবিলা ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছেন।
জলবায়ু মোকাবিলায় নেপালের প্রস্তাব
বালেন্দ্র শাহ বলেন, ভটেকোশি-ত্রিশূলী বিপর্যয় শুধু কোনও স্থানীয় ঘটনা নয়, এটা গোটা বিশ্বের জন্য একটা বড় সতর্কবার্তা। বিশ্ববাসী আদৌ সেই সতর্কবার্তা শুনতে পেয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিপর্যয়ের পর যে সব দেশ ও সংস্থা নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে ভারতের সাহায্যের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। শাহ বলেন, "ভটেকোশি-ত্রিশূলী বিপর্যয় শুধু একটা স্থানীয় ট্র্যাজেডি ছিল না, এটা গোটা বিশ্বের জন্য একটা সতর্কবার্তা। আজ আমি আপনাদের জিজ্ঞেস করছি, আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছি? নেপালের কাছে জলবায়ু বিপর্যয় শুধু কোনও মানবিক সংকট নয়, এটা উন্নয়নের ক্ষেত্রেও একটা বড় জরুরি অবস্থা।" তিনি আরও বলেন, "ভয়াবহ বন্যার পর যাঁরা আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের সবাইকে নেপালের তরফ থেকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও চিন খুব দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্যান্য বন্ধু দেশ, রাষ্ট্রসংঘ, বিভিন্ন মানবিক সংস্থা এবং সারা বিশ্বের মানুষ নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নেপালের কৃতজ্ঞ মানুষের পক্ষ থেকে আমি তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।"
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে যে দেশগুলোর দায় বেশি এবং যাদের এই পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষমতা বেশি, তাদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শাহ।
তাঁর কথায়, "রাষ্ট্রসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহল ইতিমধ্যেই সাধারণ, আলাদা দায়িত্ব এবং নিজ নিজ ক্ষমতার নীতিতে একমত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে যারা এই সমস্যার জন্য বেশি দায়ী এবং যাদের মোকাবিলার ক্ষমতা বেশি, তাদের আরও বেশি কাজ করতে হবে।"
হিন্দুকুশ-হিমালয় নিয়ে উদ্বেগ
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের গুরুত্ব তুলে ধরে শাহ বলেন, এই পর্বতমালা প্রায় ২০০ কোটি মানুষকে জল, বাস্তুতন্ত্র, কৃষি এবং জীবিকা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। নেপাল, ভারত ও চিনের নেতৃত্বে একটি হিমালয় জলবায়ু মোকাবিলা ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন শাহ। এর মাধ্যমে স্যাটেলাইট ডেটা শেয়ার করা, বিপজ্জনক হিমবাহের হ্রদগুলোর ওপর নজরদারি চালানো এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করার জন্য যৌথ উদ্যোগের ডাক দিয়েছেন তিনি। শাহ বলেন, "জলবায়ু সুবিচার বিষয়টা রাষ্ট্রসংঘের নথিতে শুধু একটা সুন্দর শব্দ হয়ে থাকতে পারে না। আমাদের দেশের মানুষকে বারবার অতীত পুনর্নির্মাণের বদলে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ দিতে হবে। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বাস। এই পর্বতমালা নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে বহু মানুষকে জল, বাস্তুতন্ত্র, কৃষি এবং জীবিকা জোগায়। হিমালয় শুধু এই গ্রহের একটা অংশ নয়, এটা পৃথিবীর লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমের একটা বড় অংশ।"
শাহের মতে, হিমালয়কে শুধু বিচ্ছিন্ন তথ্য আদানপ্রদানের জায়গা না করে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। তিনি বলেন, "...আমরা প্রস্তাব দিচ্ছি যে নেপাল, ভারত ও চিনের নেতৃত্বে একটা হিমালয় জলবায়ু মোকাবিলা ব্যবস্থা তৈরি করা হোক। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা স্যাটেলাইট ডেটা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারি। বিপজ্জনক হিমবাহের হ্রদগুলোর ওপর নজর রাখতে পারি। যৌথভাবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারি। যখন কোনও বিপর্যয় আসবে, তখন আমরা সীমানা পেরিয়ে একে অপরকে সাহায্য করতে পারব। হিমালয়কে বিচ্ছিন্ন তথ্যের সীমানা না করে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটা গবেষণাগার হিসেবে গড়ে তোলা হোক।"
পরিবেশ রক্ষায় নেপালের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। শাহ জানান, নেপাল ইতিমধ্যেই তাদের দেশের প্রায় অর্ধেক অংশে জঙ্গল ফিরিয়ে এনেছে। তাঁর কথায়, "অন্তত একটা উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটা সত্যিই উল্লেখযোগ্য বিষয়। নেপাল ইতিমধ্যেই তার পরিবেশগত হিস্যার চেয়েও বেশি বিশ্বব্যাপী ভূমিকা পালন করছে। আমরা আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক অংশে জঙ্গল ফিরিয়ে এনেছি।"


