Oldest Durga of Kolkata: কলকাতার প্রথম দুর্গা কে জানেন? চিৎপুরের চিত্তেশ্বরী মন্দিরে পুজো পান ডাকাত প্রতিষ্ঠিত প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের প্রাচীন দুর্গামূর্তি। রইল ইতিহাসের চমকপ্রদ কাহিনি।
কবে কলকাতায় প্রথম দুর্গাপুজো শুরু হয়েছিল? কে করেছিলেন এই পুজো? এই প্রশ্ন নিয়ে কাঠাছেঁড়া হয়েছে দীর্ঘদিন। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায় কলকাতার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজো হলো ১৯১০ সালে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে ‘ভবানীপুর সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’-র উদ্যোগে শুরু হওয়া দুর্গাপুজো। তেমনই বহু পুরনো পুজোগুলির একটি হল বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গাপুজো। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল কলকাতার প্রথম দুর্গা কোনটি? এর উত্তর হল চিত্রেশ্বরী। যা লোকমুখে নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে চিত্তেশ্বরী। চিৎপুরে অধিষ্ঠান কলকাতার প্রাচীনত দুর্গার।
চিত্রেশ্বরী দুর্গা
তথ্য অনুযায়ী চিৎপুরে গঙ্গার ধারে অধিষ্ঠান চিত্রেশ্বরী দেবী দুর্গার। সেখানেই উজ্জ্বল হলুদ রঙের মন্দিরে অধিষ্ঠান দেবীর। শোনা যায় চিত্রেশ্বর বা চিতে ডাকাত প্রথম এখানে দুর্গাপুজো করেন। যোগীন্দ্রনাথ গুপ্তর দেওয়ার তথ্য অনুযায়ী রঘু ডাকাতের পূর্বপুরুষ হলেন চিতে ডাকাত।
নরবলির হল কলকাতায়
শোনা যায় একটা সময় কলকাতার বুকেও হত নরবলি। চিতে ডাকাত ডাকাতি করতে বার হওয়ার আগেই নরবলি দিলেন। চিত্রেশ্বরী দেবী দুর্গার পুজো করতেন। তারপরই ডাকাতিতে বার হতেন। ১৮৪৬ সালে ক্যালক্যাটা রিভিউয়ে রেভারেন্ড লং লিখেছেন, ইউরোপিয়ানরা একে চিত্রপুর কালীমন্দির বলেই চিনতেন। তিনি আরও বলেছেন, এটাই সেই স্থান যেখানে দেবী মূর্তির সামনে সেই সময় সবথেকে বেশি নরবলি হতো। অনেকেই মনে করেন চিত্রেশ্বর নাম থেকেই চিৎপুর নামকরণ হয়েছে।
আপনি কীভাবে যাবেন?
এখনও রয়েছে প্রাচীন এই মন্দির। চিৎপুরে গঙ্গা যেখানে বাঁক নিয়েছে, বাগবাজারের দিকে গেছে সেই বাঁক থেকে ডাঙায় উঠে সোজা রাস্তা যেটা বিটি রোডের দিকে গেছে সেখানেই রয়েছে চিত্রেশ্বরী দেবীর মন্দির। কাশীপুর গান অ্যান্ড সেল ফ্যাক্টরির ২ নম্বর গেটের উল্টোদিকে অবস্থিত। ঠিকানা হল-৯ নম্বর খগেন্দ্র চ্যাটার্জি রোড, কলকাতা ৭০০০০২। চিত্রেশ্বরীর সম্পত্তিতেই তৈরি হয়েছিল গান অ্যান্ড সেলস ফ্যাক্টরি।
কালীঘাটের কালী মন্দির থেকে চিৎপুরের চিত্রেশ্বরী মন্দির যুক্তছিল গঙ্গার ধারে পায়ে চলা তীর্থযাত্রীদের জন্য তৈরি হওয়া একটি রাস্তা দিয়ে। যা সেই সময় তীর্থযাত্রীদের রাস্তা নামেই পরিচিত ছিল। গঙ্গার তীর ধরেই সময় সময় তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত ছিল। যদিও বাকি কলকাতা ছিল ছিল তখন জঙ্গলে ঘেরা। যদিও সেসময় পুরো এলাকার নামও কলকাতা ছিল না। গবিন্দপুর, সুতানুটি আর কলকাতা - তিনটি গ্রাম ছিল। চিৎপুর-শোভাবাজার-বাগবাজার, হাটখোলা ইত্যাদি নিয়ে সুতানটি। বউবাজার, ধর্মতলা, জানবাজার ইত্যাদি নিয়ে কলকাতা গ্রাম। আর হেস্টিংস, ময়দান, ভবানীপুর প্রভৃতি নিয়ে গোবিন্দপুর।
লোকগাথা
শোনা যায় গঙ্গায় ভেসে আসা নিমকাঠ দিয়েই তৈরি হয়েছিল চিত্রেশ্বরী দেবীর মূর্তি। গাড় হলুদ রঙের মূর্তি। যদিও এখানে দুর্গার বাহন সিংহ নয়, ঘোড়া আকৃতির একটি সিংহ। আর পায়ের নিচে রয়েছে বাঘ। অনেকেই মনে করেন সেই সময় এই এলাকায় বাঘের ব্যাপক উৎপাত ছিল। বাঘের হাতে প্রাণ যেত তীর্থযাত্রীদের। আর সেই কারণেই বাঘের মূর্তি রেখে পুজো করা হতো। ১৫৮৬ সালে তন্ত্রসাধক নৃসিংহ ব্রহ্মচারী প্রথম হোগলাপাতায় ঘেরা এই মন্দির খুঁজে পান। পরবর্তীতে তিনি পঞ্চমুণ্ডীর আসন তৈরি করে পুজো শুরু করেন। তারও অনেক পরে জমিদার গোবিন্দরাম মিত্র দুর্গামন্দিরটি স্থাপন করেন।
বইতে উপস্থিত চিত্রেশ্বরী দুর্গা
সুধীরকুমার মিত্র তার দেবদেবীর কথা ও কাহিনী বইতে লিখেছেন, চিতু ডাকাতের চিত্তেশ্বরী দুর্গার দারুমূর্তি পুরাবস্তু হিসেবে বাংলা দেশের প্রাচীন অন্যতম পুরাকীর্তি। তিনি আরও বলেছেন, এতো পুরাতন নিদর্শন কলকাতায় আর নেই। বিনয় ঘোষ পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি বইতে লিখেছেন, চিত্তেশ্বরীর প্রাচীনতা অস্বীকার করার বিশেষ কারণ নেই। যদিও মন্দির অর্বাচীন হতে পারে। তিনি আরও লিখেছেন, এই মূর্তি দেখাও সৌভাগ্যের। এটি প্রাচীন বাংলার একটি অসাধারণ নিদর্শন। বর্তমান মন্দিরের সেবায়েত কাশীশ্বর রায় চৌধুরী জানিয়েছেন, এবছরও ধুমধামের সঙ্গে পুজো হবে। সকল ভক্তের জন্য মন্দিরের দ্বার খোলা থাকবে।


