পাকিস্তানে প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ শিশু জীবনদায়ী টিকা পায়নি। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিকে 'জাতীয় স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা' বলে ঘোষণা করেছে পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (PMA)। তাদের মতে, দেশ এক বড়সড় স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে এবং যে কোনও মুহূর্তে রোগের মহামারী শুরু হতে পারে।
পাকিস্তানে প্রায় ৬ লক্ষ ৫১ হাজার শিশু তাদের নিয়মিত টিকাকরণ থেকে বাদ পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এত বিপুল সংখ্যক 'জিরো-ডোজ' শিশু নিয়ে পাকিস্তান এক ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এই তথ্য সামনে আসার পরেই পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (PMA) দেশজুড়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন-এর একটি রিপোর্টে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে।
জিরো-ডোজ শিশু
'জিরো-ডোজ' শিশু বলতে তাদের বোঝানো হয়, যারা ডিপথেরিয়া-টিটেনাস-পারটুসিস (DTP1) টিকার প্রথম ডোজটি পায়নি। ডন-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, PMA জানিয়েছে যে ৬,৫১,০০০ শিশু রুটিন টীকাকরণ ব্যবস্থার বাইরে থাকায় পাকিস্তান কার্যত একটি 'মহামারীর টাইম বোমা'-র উপর বসে আছে। এর ফলে যে কোনও মুহূর্তে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যুর হার ব্যাপক আকারে বেড়ে যেতে পারে।
PMA আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিস্থিতিকে 'জাতীয় জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা' বলে ঘোষণা করেছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, টিকাকরণের এই বিশাল ঘাটতির কারণে 'হার্ড ইমিউনিটি' নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা গোটা অঞ্চলকে বড়সড় রোগের প্রাদুর্ভাবের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
PMA-র সাধারণ সম্পাদক ডক্টর আব্দুল গফুর শোরো বলেন, "চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে, দেশে পাঁচ লক্ষেরও বেশি জিরো-ডোজ শিশুর উপস্থিতি প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুরোপুরি ভেঙে পড়ারই ইঙ্গিত দেয়।" তিনি আরও যোগ করেন, "এই ভয়ঙ্কর পরিসংখ্যানের পিছনে রয়েছে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেওয়া এক গভীর পদ্ধতিগত অবক্ষয়।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক আঞ্চলিক মহামারী সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করে ডন জানিয়েছে যে, এই অঞ্চলের মোট জিরো-ডোজ শিশুর ৯০ শতাংশই পাঁচটি দেশে রয়েছে: সুদান, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং সোমালিয়া।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই তালিকায় পাকিস্তানের নাম থাকাটা মূলত প্রশাসনিক অবহেলা এবং শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতারই ফল। ডক্টর শোরো বলেন, "পাকিস্তানের মতো একটি দেশ, যেখানে কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই, সেখানে এই অঞ্চলের মোট জিরো-ডোজ শিশুর ১৪ শতাংশ থাকাটা শাসনব্যবস্থার এক চরম ব্যর্থতা।"
ডন-এর খবর অনুযায়ী, PMA এই সংকটের জন্য বেশ কিছু গুরুতর ব্যর্থতা এবং পরিকাঠামোগত দুর্নীতিকে দায়ী করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক পদে স্বজনপোষণ, সম্প্রসারিত টীকাকরণ কর্মসূচি (EPI) দুর্বল হয়ে পড়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছনোর জন্য সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক তৈরিতে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা এবং টীকা নিয়ে দ্বিধা দূর করতে সক্রিয় পদক্ষেপ না নেওয়া।
PMA এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, "৬,৫১,০০০ জিরো-ডোজ শিশুর এই সংখ্যাটা কয়েক দশকের দুর্নীতি, প্রশাসনিক অবহেলা এবং দেশের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব না দেওয়া ধারাবাহিক সরকারগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের সরাসরি ফল।"
এই সংকট মোকাবিলায় PMA কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাদেশিক EPI এবং স্বাস্থ্য দপ্তরগুলিতে বরাদ্দ সমস্ত তহবিলের অডিট, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কেনাকাটায় দুর্নীতি বন্ধ করা এবং অবহেলার জন্য দায়ী প্রশাসকদের জবাবদিহি করা।
সংগঠনটি প্রাদেশিক এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে রুটিন টীকাকরণকে একটি 'জাতীয় নিরাপত্তা অগ্রাধিকার' হিসেবে ঘোষণা করারও আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টীকা দেওয়ার জন্য স্থানীয় GIS-ম্যাপিং ভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে, বিশেষ করে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলিতে।
এছাড়াও, PMA টীকার গুণমান বজায় রাখতে সাপ্লাই চেন আধুনিকীকরণ, স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন মেটানো, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং তাঁদের জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।


