ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটা প্রস্তাবেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তোলপাড়। আব্রাহাম চুক্তি আর ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে পাকিস্তান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফের কড়া বয়ান, ইরান চুক্তি আর কূটনৈতিক চাপের মাঝে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বজুড়ে কি নতুন কোনো জোট-সংঘাত শুরু হতে চলেছে?
ইসলামাবাদ/ওয়াশিংটন: পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড়সড় তোলপাড় শুরু হয়ে গেল, যখন পাকিস্তান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বপ্নের 'আব্রাহাম চুক্তি' (Abraham Accords)-তে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দিল। পাকিস্তানের এই কড়া এবং আক্রমণাত্মক মনোভাবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে জোরদার আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামাবাদ সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা ইজরায়েলের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক কোনোদিনও স্বাভাবিক করবে না।

ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া ধামাকা: ৬টি মুসলিম দেশকে একসঙ্গে চরমপত্র!
এই বিতর্কের সূত্রপাত হয় যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর পোস্ট করেন। ট্রাম্প জানান যে তিনি সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং জর্ডনকে একসঙ্গে এই শান্তি চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন। ট্রাম্প এই কূটনৈতিক পদক্ষেপকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলা ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে এটাকে প্রায় বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করেন। ট্রাম্পের মতে, যদি ইরান আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করে, তাহলে এই ঐতিহাসিক বিশ্বজোটে অংশ নেওয়াটা পাকিস্তান-সহ অন্যান্য দেশের জন্য একটা বড় সম্মানের বিষয় হবে।

"যাদের বিশ্বাস করা যায় না, তাদের সঙ্গে কিসের চুক্তি?" – প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের পালটা удар
ট্রাম্পের এই বিরাট কূটনৈতিক চাপের মুখে পাকিস্তান জবাব দিতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ 'সমা টিভি'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে তুলোধোনা করেন। খাজা আসিফ অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, "ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি না যে আমাদের এমন কোনো চুক্তির অংশ হওয়া উচিত যা আমাদের দেশের মূল আদর্শ এবং নীতির বিরুদ্ধে যায়।" ইজরায়েলের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও বলেন, "যাদের মুখের কথার এক দিনের জন্যও ভরসা করা যায় না, তাদের সঙ্গে আপনি কীভাবে আলোচনায় বসবেন? আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার যে এই প্রস্তাব কোনোভাবেই আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।"
ইরান চুক্তি আর আব্রাহাম চুক্তি: ভেতরের কথা ফাঁস করল পাকিস্তানি সূত্র
এদিকে, গোটা ঘটনার উপর নজর রাখা এক উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি সূত্র CNBC-কে জানিয়েছে যে আমেরিকার ইরান শান্তি আলোচনা এবং আব্রাহাম চুক্তির সদস্যপদকে এক করে ফেলার চেষ্টাটা একেবারেই অযৌক্তিক। সূত্রটি স্পষ্ট করে, "এই দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয় এবং এদের একসঙ্গে জোড়া যায় না। আমেরিকার এই ধরনের একতরফা দাবি মেনে চলার কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পাকিস্তানের নেই।" উল্লেখ্য, মূল আব্রাহাম চুক্তিটি ট্রাম্প তাঁর প্রথম দফার রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ২০২০ সালে মধ্যস্থতা করে করিয়েছিলেন। এই চুক্তির অধীনে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE), বাহরাইন, মরক্কো এবং সুদানের সঙ্গে ইজরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়েছিল। এখন তাঁর দ্বিতীয় দফায় ট্রাম্প এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়াতে চাইছেন।
ইজরায়েলকে দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ: পাকিস্তানের সেই পুরনো 'পাসপোর্ট আইন'
পাকিস্তানের এই কড়া অবস্থান অবশ্য নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান বিশ্বের সেই হাতেগোনা দেশগুলির মধ্যে একটি, যারা ইজরায়েলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না। এমনকি পাকিস্তানি পাসপোর্টে বড় বড় করে লেখা থাকে যে "এই পাসপোর্ট ইজরায়েল ছাড়া বিশ্বের সমস্ত দেশের জন্য বৈধ।" যদিও ট্রাম্প বাকি যে পাঁচটি দেশের (সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিশর এবং জর্ডন) সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তারা এখনও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। কিন্তু এই মুসলিম প্রধান দেশগুলির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং ইজরায়েলের প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর অবিশ্বাসকে মাথায় রাখলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে ট্রাম্পের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনায় একটা বড় ধাক্কা লেগেছে।

