সুইজারল্যান্ডে আমেরিকা-ইরানের বহু প্রতীক্ষিত শান্তি বৈঠক হঠাৎ করেই বাতিল হয়ে গেল। হোয়াইট হাউস বলছে 'লজিস্টিকস'-এর সমস্যা, কিন্তু আসল কারণ কি লেবাননে ইজরায়েলি হামলা? মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্স যেভাবে ইজরায়েলের সমালোচনা করেছেন, তাতে কি দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল আরও চওড়া হচ্ছে? ভেস্তে যেতে বসেছে কি ১৪ দফার শান্তি চুক্তি?

US Iran Talks: মধ্যপ্রাচ্যে যখন রোজ রক্ত ঝরছে, তখন শান্তির আশায় তাকিয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ভেস্তে গেল আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বৈঠক। যুদ্ধের অবসানের জন্য দু'দিন আগেই ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে ডিজিটাল সই হয়েছিল ১৪ দফার একটি মউ (MoU)। কথা ছিল, সুইজারল্যান্ডের মনোরম পরিবেশে এই শান্তি চুক্তিতে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়বে। কিন্তু শুক্রবারের সেই বৈঠক হঠাৎ বাতিল হওয়ায় গোটা বিশ্ব চমকে গেছে। এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেল।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

বারগেনস্টক রিসর্টের রহস্য: শেষ মুহূর্তে কেন বাতিল হল জেডি ভেন্সের সফর?

এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের অত্যন্ত সুন্দর এবং সুরক্ষিত বারগেনস্টক মাউন্টেনটপ রিসর্ট। কাতারের সরকারি সম্পদ তহবিল (কাতারা হসপিটালিটি) এর মালিক। গোপনীয়তা এবং নিয়ন্ত্রিত সুরক্ষার জন্য এই জায়গা বিখ্যাত, যেখানে বিশ্বের তাবড় গোপন আন্তর্জাতিক বৈঠক হয়ে থাকে। রহস্য দানা বাঁধে যখন হোয়াইট হাউস হঠাৎ ঘোষণা করে যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্সের সুইজারল্যান্ড সফর স্থগিত করা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এর জন্য 'লজিস্টিকস সংক্রান্ত জটিলতা'-কে দায়ী করেছেন। জেডি ভেন্স নিজেও একটি বিবৃতিতে বলেন, "ইরান এমন দেশ নয় যেখান থেকে সহজে বেরোনো যায়। সবকিছু নির্ভর করছে ইরানের প্রতিনিধি দল কখন সেখানে পৌঁছাতে পারবে তার ওপর।" নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি রিপোর্টও দাবি করেছে যে, ইরানের প্রতিনিধি দল সময়মতো ভেন্যুতে পৌঁছাতে পারেনি।

আসলে কেন পিছিয়ে গেল তেহরান?

তবে এই লজিস্টিকসের সমস্যার পিছনে আরও একটি কৌশলগত কারণ উঠে আসছে। অ্যাক্সিওস (Axios) জানাচ্ছে, একজন মার্কিন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে লেবাননে ইজরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে। হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ প্যান-আরব চ্যানেল 'আল-মায়াদিন'-এর খবর অনুযায়ী, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সাময়িক চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননে হামলা থামায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে ইজরায়েলি হামলায় ১৬ জন নিরীহ মানুষ মারা গিয়েছেন। তেহরান আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, লেবাননে রক্তপাত পুরোপুরি বন্ধ না হলে কোনও শান্তি আলোচনা এগোবে না।

একগুঁয়ে নেতানিয়াহু: 'সিকিউরিটি জোন' থেকে সেনা সরাবে না ইজরায়েল

শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পিছনে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর একগুঁয়ে মনোভাবও আগুনে ঘি ঢেলেছে। নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইজরায়েলের নিরাপত্তার জন্য যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইজরায়েলি সেনা দক্ষিণ লেবাননের "সিকিউরিটি জোন"-এ মোতায়েন থাকবে। ইজরায়েলের এই আগ্রাসী মনোভাব কাতার এবং আমেরিকার মধ্যস্থতার চেষ্টায় বড় ধাক্কা দিয়েছে, কারণ ইরান একে সরাসরি যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন বলে মনে করছে।

আমেরিকা ও ইজরায়েলের মধ্যে কি দূরত্ব বাড়ছে?

এই গোটা ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভেন্সের সাংবাদিক সম্মেলন, যেখানে তিনি ইজরায়েলি নেতৃত্বের প্রকাশ্যে তুলোধোনা করেন। ভেন্সের এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ওয়াশিংটন এবং তার সবচেয়ে পুরোনো বন্ধু ইজরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের ফাটল আরও গভীর হয়েছে। ভেন্স ইজরায়েলি মন্ত্রিসভাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন: "ডোনাল্ড জে. ট্রাম্পই এই মুহূর্তে বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ইজরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল... আমি যদি ইজরায়েলি সরকারে থাকতাম, তাহলে আমার একমাত্র শক্তিশালী বন্ধু (আমেরিকা)-কে আক্রমণ বা অবজ্ঞা করতাম না।"

৬০ দিনের কাউন্টডাউন এবং মোজতাবা খামেনেইর দাবি

চুক্তি/MoU-এর বিষয়সময়সীমা/বর্তমান অবস্থা
পারমাণবিক কর্মসূচিতে পাকা বোঝাপড়া৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা শেষ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)তেল চলাচল যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
খামেনেইর দাবিমার্কিন প্রেসিডেন্ট 'হতাশা' থেকে এই চুক্তি করেছেন।

 যদিও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনেই আমেরিকার সঙ্গে এই সরাসরি আলোচনার সমর্থন করেছেন, কিন্তু তিনি কটাক্ষ করে বলেছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতাশা থেকে এই চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। যাই হোক, এই ৬০ দিনের সময়সীমা এখন আরও জটিল হয়ে পড়েছে। যদি এই আলোচনা দ্রুত আবার শুরু না হয়, তাহলে হরমুজ প্রণালীর জলপথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মাটি আরও একবার বড়সড় যুদ্ধের আগুনে পুড়তে পারে।

ইরান-আমেরিকা শান্তি আলোচনায় এরপর কী হবে?

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ১৪-দফা চুক্তির পর আশা জেগেছিল যে দশকের পর দশক ধরে চলা শত্রুতা ধীরে ধীরে আলোচনার টেবিলে মিটতে পারে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের বৈঠক বাতিল হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে শান্তির পথ এখনও খুবই ভঙ্গুর। এখন গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, দুই পক্ষ কি দ্রুত নতুন তারিখ ঘোষণা করবে, নাকি লেবানন, ইজরায়েল এবং আঞ্চলিক রাজনীতির জটিলতা এই সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়াকে আবার অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেবে।