আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি রিপোর্টে আমেরিকাকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে 'পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে' রণকৌশল ব্যর্থ এবং বিপর্যয়কর হবে। রিপোর্টে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য বিদ্যুৎ ও জলের পরিকাঠামোয় হামলা চালালে ব্যাপক মানবিক সংকট তৈরি হবে, কিন্তু ইরানের সেনাবাহিনীর কোনও ক্ষতি হবে না।

ভুল রণকৌশল 'পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে'

আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রকাশিত একটি রিপোর্ট মার্কিন প্রশাসনকে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছে। জোসেফ ওয়েবস্টার এবং জিঞ্জার ম্যাকেটের লেখা এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে 'পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে' নামে যে রণকৌশলের কথা ভাবা হচ্ছে, তা আমেরিকার জন্যই বুমেরাং হতে পারে। লেখকদের মতে, সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য পরিকাঠামোয় হামলা চালানো শুধু কৌশলগতভাবেই ভুল নয়, এর ফলে মারাত্মক মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসবে।

ওয়েবস্টার ও ম্যাকেট পরিষ্কার জানিয়েছেন, ইরানের সেনাবাহিনী তাদের প্রধান কাজগুলোর জন্য দেশের সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভর করে না। রিপোর্টে বলা হয়েছে, "ইরানের সাধারণ মানুষের শক্তি ও জলের পরিকাঠামো ধ্বংস করলে যুদ্ধ তো থামবেই না, বরং সংঘাত আরও বাড়বে এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে।" এর ফলে সাধারণ মানুষের "অকল্পনীয়" দুর্ভোগ হবে। "প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলিতে (desalination plants) হামলার হুমকি দিয়েছেন। এর আগেও তিনি ইরানের শক্তি ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় বোমা ফেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। আমেরিকা বা ইজরায়েল যদি এই হামলা চালায়, তবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে, কিন্তু ইসলামিক রিপাবলিকের সামরিক ক্ষমতার তেমন কোনও ক্ষতি হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের হাতে ভালো বিকল্প এমনিতেই কম, তার মধ্যে শক্তি ও জল পরিকাঠামোয় হামলা কোনওভাবেই একটি ভালো বিকল্প হতে পারে না।"

সাধারণ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল নয় সেনাবাহিনী

ইরানের বেশিরভাগ সামরিক ঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ মিসাইল সাইলো এবং কমান্ড সেন্টারগুলির নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও তাদের মজবুত ব্যাকআপ সিস্টেমও আছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, "বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস হয়ে গেলে ইরানের সাধারণ মানুষ মারাত্মক বিপদে পড়বেন, কারণ এর ওপর জল সরবরাহ ব্যবস্থা নির্ভরশীল। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর সেনাবাহিনীর তেমন কোনও প্রত্যক্ষ ক্ষতি হবে না। গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত কিছু উৎপাদন কেন্দ্র ছাড়া—যেগুলিতে আলাদাভাবে নিশানা করা যায়—ইরানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিশেষ কোনও যোগ নেই।"

পুরো পাওয়ার গ্রিড বসে গেলেও সেনাবাহিনীর যুদ্ধ করার ক্ষমতায় "তেমন কোনও আঁচড় পড়বে না"। "অন্যান্য সেনাবাহিনীর মতোই ইরানের সেনাও মূলত ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের মতো জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল (যদিও ইরানের বিমানবাহিনী এখন প্রায় অকেজো, তাই জেট ফুয়েলের ব্যবহার কমেছে)। ডিজেল শুধু মাসখানেকের জন্য মজুত করে রাখা যায় তাই নয়, দেশের মোট ডিজেল ব্যবহারের খুব সামান্য অংশই সেনাবাহিনী ব্যবহার করে।" রিপোর্টে বলা হয়েছে, "কিন্তু এই হামলায় ইরানের সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষতি হবে।"

মানবিক বিপর্যয় এবং 'জল-শক্তি সংকট'

রিপোর্টে ইরানের "জল ও শক্তির পারস্পরিক নির্ভরশীলতা"-র ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ৯ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের এই দেশে মাটির তলার জল তোলার পাম্প এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিদ্যুতের ওপরই চলে। গ্রিড ধ্বংস হয়ে গেলে পানীয় জলের সরবরাহ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে ব্যাপক জলকষ্ট দেখা দেবে এবং দ্রুত জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়বে।

"ইরানের ৯ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ জীবনধারণের জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল, যার মধ্যে রয়েছে কুলিং সিস্টেম, হাসপাতালের পরিষেবা এবং আরও অনেক কিছু। এছাড়াও, ভূগর্ভস্থ কুয়ো থেকে জল তোলা এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিদ্যুতের মাধ্যমেই চলে। তাই ইরানের জল পরিকাঠামোয় হামলা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগ, ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার সংকট তৈরি হবে। শিশু ও নবজাতকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকে ব্ল্যাকআউট এবং জল সংকটের কারণে টাইফয়েড, কলেরা, গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং ম্যালেরিয়ার মতো মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল। কিছু হিসেব অনুযায়ী, যুদ্ধের স্বাস্থ্যগত প্রভাবে প্রায় ১ লক্ষ ইরাকি মারা যান। শিশু মৃত্যুর হার তিনগুণেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল," রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখকরা বলেছেন, হাসপাতাল, খাবার ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা এবং কুলিং সিস্টেম (যা ওই অঞ্চলের আবহাওয়ায় অত্যন্ত জরুরি) বিকল হয়ে পড়বে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর হার বাড়বে।

আমেরিকার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে

"ইরানের জল পরিকাঠামোয় বিমান হামলার নৈতিক এবং আইনি দিকগুলো বাদ দিলেও, এই হামলা আমেরিকার যুদ্ধের উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করবে। ইরানের জল পরিকাঠামো ধ্বংস করলে আমেরিকার প্রতি মানুষের সদ্ভাব নষ্ট হবে। অনেক ইরানি—এমনকি যারা সাহসের সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন—তারাও আমেরিকাকে তাদের মুক্তির দূত না ভেবে শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করবেন।"

ইরানের সাধারণ মানুষ দূরে সরবে

লেখকদের মতে, এই ধরনের হামলা আসলে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যেরই ক্ষতি করবে। যে সমস্ত ইরানিয়ানরা নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে, তারাও আমেরিকাকে নিজেদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখবে। এর ফলে তারা একজোট হয়ে "বাইরের শত্রু"-র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

উপসাগরীয় মিত্রদের ঝুঁকি

"আমেরিকা হয়তো উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর সমর্থনও হারাতে পারে। শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলটিই জল ও বিদ্যুতের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর টিকে আছে। জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলিতে প্রচুর পরিমাণে শক্তি লাগে, যার মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল রয়েছে; সৌদি আরব একাই জল পরিশোধনের জন্য দিনে প্রায় ৩ লক্ষ ব্যারেল তেল ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়াটি শক্তি-নির্ভর হওয়ায়, জিসিসি (GCC) দেশগুলির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জল পরিশোধন কেন্দ্র জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ, জল ও বিদ্যুৎ একসঙ্গেই উৎপাদিত হয়। ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন বা শোধনাগারে হামলা যেমন দেশের জল সরবরাহকে অস্থিতিশীল করে তুলবে, তেমনই আঞ্চলিক দেশগুলির বিদ্যুৎ সম্পদে যে কোনও হামলা সেখানেও জল সংকট তৈরি করতে পারে। মাত্র ৫৬টি প্ল্যান্ট উপসাগরীয় অঞ্চলের ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিশোধিত জলের জোগান দেয়। তাই ইরানের পাল্টা হামলায় গোটা অঞ্চলে মারাত্মক সংকট তৈরি হতে পারে," রিপোর্টে যোগ করা হয়েছে।

ইরানের প্রতিশোধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা

ইরান ইতিমধ্যেই "ইটের বদলে পাটকেল" ধরনের প্রতিশোধমূলক রণকৌশল দেখিয়েছে। যদি তাদের পরিকাঠামোয় হামলা হয়, তবে তারা সম্ভবত উপসাগরীয় দেশগুলির জল পরিশোধন কেন্দ্র (যা জিসিসি দেশগুলির ৯০% জলের জোগান দেয়) এবং ইজরায়েলের নিজস্ব জল পরিকাঠামোকে নিশানা করবে। পাল্টা হামলায় ইজরায়েলের জল পরিশোধন কেন্দ্রগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশটি তার পানীয় জলের ৮০% হারাতে পারে।

ট্রাম্পের চরমপত্র ও হুমকি

উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তার কথা না মানা হলে ইরানের "প্রতিটি" বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং সেতুতে একযোগে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হবে। তিনি হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য ইরানকে মঙ্গলবার রাত ৮টা (ওয়াশিংটন সময়) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। ট্রাম্প সোমবার বলেন, লক্ষ্য হবে চার ঘণ্টার মধ্যে এই সমস্ত পরিকাঠামোকে "জ্বলন্ত, বিস্ফোরিত এবং আর কখনও ব্যবহার করার অযোগ্য" করে দেওয়া। হোয়াইট হাউসের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প বলেন, "পুরো দেশটাকে এক রাতে শেষ করে দেওয়া যেতে পারে, আর সেই রাতটা হয়তো কাল রাতেই হতে পারে।"

ট্রাম্প মঙ্গলবার রাত ৮টার (ইস্টার্ন টাইম) আগে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার চরমপত্রও দিয়েছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এরপরে "কোনও সেতু থাকবে না, কোনও পাওয়ার প্ল্যান্ট থাকবে না।" ট্রাম্প বলেন, এটি একটি "গুরুত্বপূর্ণ সময়" এবং ওয়াশিংটন তেহরানকে এই যুদ্ধ শেষ করার জন্য চুক্তি করতে প্রয়োজনীয় সময় দিয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, "এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়... ওরা সাত দিনের সময় চেয়েছিল; আমি ওদের দশ দিন দিয়েছি... ওদের কাছে কাল পর্যন্ত সময় আছে। এখন দেখা যাক কী হয়... এতে অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আমরা ওদের কাল রাত ৮টা, ইস্টার্ন টাইম পর্যন্ত সময় দিচ্ছি। এরপর ওদের কোনও সেতু থাকবে না। কোনও পাওয়ার প্ল্যান্ট থাকবে না। প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেব।"

বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ায় ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। রিপোর্টটি সতর্ক করেছে যে, ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেল শোধনাগারগুলি ধ্বংস করা হলে তা "সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বিশ্ব জ্বালানি সংকট" তৈরি করবে। এর ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি গভীর মন্দার কবলে পড়তে পারে।