একই ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা হওয়া সত্ত্বেও ভারত ও ইউরোপে গরমের অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। এর প্রধান কারণ হল আর্দ্রতার পার্থক্য, যা ইউরোপে 'হিট ইনডেক্স' মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। 

দিল্লি বা রাজস্থানে গ্রীষ্মকালে ৪৩-৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রায় প্রতি বছরই হয়। মানুষ ছাতা মাথায়, রাস্তায় বেরোয়, কাজ করে। কিন্তু সেই ৪৩ ডিগ্রিই যখন স্পেন, ফ্রান্স বা ইটালিতে পড়ে, তখন রেড অ্যালার্ট জারি হয়, স্কুল-অফিস বন্ধ, হাসপাতাল ভর্তি হিটস্ট্রোকের রোগী। গত বছর ইউরোপে শুধু গরমেই ৬০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। প্রশ্ন ওঠে, থার্মোমিটারের কাঁটা তো একই জায়গায়, তাহলে ভারতের মানুষের গায়ে লাগে না কেন? জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা এক হলেও ‘গরম’ এক নয়। এর পিছনে পাঁচটা বড় কারণ আছে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

প্রথম আর সবচেয়ে বড় কারণ হল আর্দ্রতা বা হিউমিডিটি। আমাদের শরীর ঠান্ডা হওয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক উপায় হল ঘাম। ঘাম বাষ্প হয়ে উবে গেলে শরীর থেকে তাপ বেরিয়ে যায়, আমরা ঠান্ডা অনুভব করি। রাজস্থান বা দিল্লির ৪৩ ডিগ্রি হল ‘ড্রাই হিট’। বাতাসে জলীয় বাষ্প কম, মাত্র ১০-১৫%। ফলে দরদর করে ঘাম হলেও সেটা সাথে সাথে শুকিয়ে যায় আর শরীর ঠান্ডা হয়। একে বলে ইভাপোরেটিভ কুলিং। কিন্তু ইউরোপের ৪৩ ডিগ্রি আসে ভূমধ্যসাগর থেকে আসা গরম ও আর্দ্র হাওয়ার কারণে। সেখানে আর্দ্রতা ৫০-৬০% বা তারও বেশি। বাতাস আগে থেকেই জলে ভরা, তাই শরীরের ঘাম আর শুকাতে পারে না। ঘাম গায়ে বসে থাকে, শরীরের তাপও ভিতরে আটকে থাকে। আবহাওয়া দপ্তর একে বলে ‘হিট ইনডেক্স’ বা ‘রিয়েল ফিল’। ইউরোপে ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৬০% আর্দ্রতা থাকলে শরীরের অনুভূতি হয় ৫৪-৫৫ ডিগ্রির মতো। এই অবস্থাকে ‘ওয়েট বাল্ব টেম্পারেচার’ ৩৫ ডিগ্রি পেরিয়ে গেলে বলা হয়, তখন ছায়ায় বসে পাখার তলাতেও সুস্থ মানুষ ৬ ঘণ্টায় মারা যেতে পারে, কারণ শরীর আর নিজেকে ঠান্ডা করতে পারে না।

দ্বিতীয় কারণ হল রাতের তাপমাত্রা। ভারতে দিনে ৪৩ ডিগ্রি হলেও রাতে সেটা ২৮-৩০ ডিগ্রিতে নেমে আসে। এই সময়টায় শরীর, বাড়ির দেওয়াল, রাস্তা ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায়। মানুষও রাতে ঘুমিয়ে শরীরের স্ট্রেস কমাতে পারে। কিন্তু ইউরোপের হিটওয়েভের সময় রাতের তাপমাত্রাও ৩০-৩২ ডিগ্রির নিচে নামে না। একে ‘ট্রপিকাল নাইটস’ বলে। টানা ২৪ ঘণ্টা গরমে শরীর রিকভার করার সময় পায় না, ফলে হার্ট, কিডনির উপর চাপ পড়ে হিটস্ট্রোক হয়।

তৃতীয় কারণ হল পরিকাঠামো ও অভ্যাস। ভারতের বাড়ি, অফিস, জীবনযাত্রা শত শত বছর ধরে গরমের সাথে লড়াই করে তৈরি। মোটা দেওয়াল, উঁচু সিলিং, খসখস, দই-লস্যি খাওয়া, দুপুরে কাজ বন্ধ রাখা - এগুলো সবই গরমের অ্যাডাপ্টেশন। আমাদের শরীরও ছোটবেলা থেকে এই গরমে অভ্যস্ত। কিন্তু ইউরোপের শহর, বাড়ি, ট্রান্সপোর্ট সব তৈরি হয়েছে ঠান্ডা আটকানোর জন্য। ওখানে ৯০% বাড়িতে এসি নেই, কারণ ঐতিহাসিকভাবে দরকার পড়েনি। ডবল গ্লেজড জানালা, কার্পেট, ইনসুলেশন শীতকালে ঘর গরম রাখে, কিন্তু গরমকালে সেই ঘরই ওভেন হয়ে যায়। ওদের শরীরেও ঘামগ্রন্থি কম সক্রিয়, গরমে অভ্যস্ত নয়।

চতুর্থ কারণ হল বাতাসের গতি। ভারতে গ্রীষ্মকালে লু বয়, গরম হাওয়া দেয়। অস্বস্তি হলেও এই হাওয়া ঘাম শুকাতে সাহায্য করে। ইউরোপের হিটওয়েভের সময় প্রায়ই ‘হিট ডোম’ তৈরি হয়। একটা বিশাল উচ্চচাপের বলয় আকাশে ছাতার মতো বসে যায়। ফলে গরম হাওয়া উপরে উঠতে পারে না, বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই গরম হাওয়া মাটির কাছে আটকে থেকে তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে।

শেষ কারণ হল জনসংখ্যার বয়স। ইউরোপের গড় বয়স ভারতের চেয়ে অনেক বেশি। বয়স্ক মানুষের শরীরে জল কম থাকে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম, হার্ট দুর্বল। তাই অল্প গরমেই তাদের মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ভারতে ইয়ং পপুলেশন বেশি, শরীর তুলনামূলকভাবে গরম সইতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন ইউরোপে এই ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রতি ২-৩ বছর অন্তরই আসছে, যেখানে আগে ৫০ বছরে একবার হত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের মতো দেশে শুষ্ক গরমে ৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত মানুষ লড়াই করতে পারে, কিন্তু ইউরোপের আর্দ্র গরমে ৪০ ডিগ্রিই ‘কিলার হিট’ হয়ে উঠছে। তাই তাপমাত্রার সংখ্যা দেখে তুলনা করা ভুল। আসল বিপদ লুকিয়ে আছে হিট ইনডেক্স, রাতের তাপমাত্রা আর আমরা কতটা প্রস্তুত তার মধ্যে।