Health News: তীব্র গরম আর বায়ু দূষণের কারণে বাড়ছে ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিসের ঝুঁকি। মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের আবরণে সংক্রমণ থেকে হয় এই প্রাণঘাতী রোগ। তীব্র জ্বর, মাথা যন্ত্রণা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি এর প্রধান লক্ষণ। শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি বেশি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
Healthcare: গরম বাড়ছে লাফিয়ে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাতাসে ধুলো-দূষণ। আর এই দুইয়ের জোড়া ফলায় চুপচাপ বেড়ে চলেছে এক ভয়ংকর রোগের ঝুঁকি। নাম ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিস। শুনতে সাধারণ জ্বর মনে হলেও, এটা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মেডিকেল ইমার্জেন্সি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সুস্থ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে এই রোগ। ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিস কী? আমাদের মস্তিষ্ক আর স্পাইনাল কর্ড একটা পাতলা পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকে। তার নাম মেনিনজেস। কোনও কারণে ব্যাক্টেরিয়া রক্তের মাধ্যমে এই পর্দায় পৌঁছে সংক্রমণ ঘটালে তাকে বলে ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিস। মেনিনজোকক্কাস, নিউমোকক্কাস, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা এর মতো ব্যাক্টেরিয়া এর জন্য দায়ী।
গরম ও দূষণের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র গরমে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। আবার বায়ু দূষণের ফলে নাক-গলার মিউকাস মেমব্রেন দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুটো কারণেই ব্যাক্টেরিয়া সহজে শরীরে ঢুকে রক্তে মিশে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। হোস্টেল, মেস, গণপরিবহণের মতো ভিড় জায়গায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। তাই গরমকাল আর দূষণপূর্ণ শহরে এর প্রকোপ বেশি।
লক্ষণগুলো চিনে নিন, দেরি করবেন না
ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিসের লক্ষণ খুব দ্রুত দেখা দেয়। সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করলেই বিপদ।
১. হঠাৎ তীব্র জ্বর: ১০৩-১০৪ ডিগ্রি জ্বর ওঠে। সাথে কাঁপুনি থাকে।
২. অসহ্য মাথা যন্ত্রণা: এমন মাথা ব্যথা যা আগে কখনও হয়নি। আলো সহ্য হয় না।
৩. ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া: থুতনি বুক পর্যন্ত নামানো যায় না। এটা সবচেয়ে ক্লাসিক লক্ষণ।
৪. বমি বমি ভাব বা বমি: জ্বরের সঙ্গে বারবার বমি হতে পারে।
৫. খিঁচুনি: ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি হতে পারে।
৬. ঝিমুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: রোগী কনফিউজড থাকে। ডাকলে সাড়া দেয় না।
৭. গায়ে র্যাশ: বিশেষ করে মেনিনজোকক্কাল মেনিনজাইটিসে লাল বা বেগুনি র্যাশ দেখা যায়। গ্লাস দিয়ে চাপ দিলেও মেলায় না।
শিশুদের ক্ষেত্রে একটানা কান্না, খেতে না চাওয়া, মাথার তালু ফুলে যাওয়া, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
পাঁচ বছরের নীচের শিশু, ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক, ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগী, যাদের স্প্লিন কেটে বাদ দেওয়া হয়েছে, হোস্টেলে থাকা ছাত্রছাত্রী আর ধূমপায়ীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
চিকিৎসা কী?
এটা এমন রোগ নয় যে বাড়িতে প্যারাসিটামল খেয়ে সেরে যাবে। সন্দেহ হলেই সোজা হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যেতে হবে। লাম্বার পাংচার করে স্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা করে রোগ নিশ্চিত করেন ডাক্তাররা। সাথে সাথে শিরায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু হয়। যত দেরি, তত ব্রেন ড্যামেজ, বধিরতা, এমনকী মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
বাঁচতে কী করবেন? ৫টি নিয়ম মানুন:
১. ভ্যাকসিন নিন: মেনিনজাইটিসের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। Hib ভ্যাকসিন শিশুদের নিয়মিত টিকাকরণের অংশ। এছাড়া মেনিনজোকক্কাল আর নিউমোকক্কাল ভ্যাকসিনও আছে। হোস্টেলে যাওয়ার আগে বা ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপের লোকেদের ডাক্তারের পরামর্শে ভ্যাকসিন নিয়ে নেওয়া উচিত।
২. মাস্ক আর দূরত্ব: ভিড় বাস, ট্রেন, বাজারে মাস্ক পরুন। হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢাকুন। এই রোগ ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।
৩. জল খান, শরীর ঠান্ডা রাখুন: গরমে ডিহাইড্রেশন এড়াতে দিনে ৩-৪ লিটার জল খান। ORS, ডাবের জল খান। রোদ এড়িয়ে চলুন। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক থাকলে ব্যাক্টেরিয়া সহজে কাবু করতে পারে না।
৪. পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: বাইরে থেকে এসে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন। অন্যের ব্যবহার করা গ্লাস, বোতল, তোয়ালে ব্যবহার করবেন না। নাক-মুখে হাত দেওয়ার অভ্যাস কমান।
৫. ধূমপান ছাড়ুন: ধূমপানে গলা ও শ্বাসনালীর মিউকাস মেমব্রেন নষ্ট হয়। ফলে ব্যাক্টেরিয়ার ঢোকার রাস্তা সহজ হয়ে যায়। নিজের ও পরিবারের জন্য ধূমপান ছাড়ুন।
মনে রাখবেন: ব্যাক্টেরিয়াল মেনিনজাইটিস ছোঁয়াচে কিন্তু আতঙ্কের কিছু নেই। সময়মতো ধরা পড়লে অ্যান্টিবায়োটিকে পুরোপুরি সেরে যায়। কিন্তু দেরি করলে ফল মারাত্মক। তাই তীব্র জ্বরের সঙ্গে ঘাড় শক্ত আর অসহ্য মাথা যন্ত্রণা হলে এক মিনিটও নষ্ট না করে ডাক্তারের কাছে যান।
এই গরমে নিজে সতর্ক থাকুন, পরিবারকেও সতর্ক করুন। একটা শেয়ার হয়তো কারও প্রাণ বাঁচাতে পারে।
আরও খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।


