সম্প্রতি সমীক্ষা বলছে ১০ জনের মধ্যে ৭ জনই শরীর খারাপ হলেই আগে গুগলে সিম্পটম লেখেন। "মাথা ব্যথা + জ্বর" লিখলেই গুগল বলে দিচ্ছে ব্রেন টিউমার। ভয় পেয়ে রোগী ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন আতঙ্ক নিয়ে।
রাত ২টায় পেট ব্যথা, গুগল খুলেই আতঙ্ক? পরিচিত দৃশ্য। হালকা মাথা ঘুরছে, গুগলে লিখলেন "মাথা ঘোরা কারণ"। রেজাল্টে প্রথমেই ক্যান্সার, স্ট্রোক, ব্রেন ড্যামেজ। ৫ মিনিটের মধ্যে সুস্থ মানুষও নিজেকে মৃত ভাবতে শুরু করে। ডাক্তার দেখানোর পরও মনে খচখচ - "গুগল তো অন্য কথা বলল"। এই "সাইবারকন্ড্রিয়া" বা ইন্টারনেটে রোগ খোঁজার নেশা এখন মহামারির মতো। কিন্তু এর আসল দায়টা কার?

আমেরিকা-ভারত মিলিয়ে সমীক্ষায় দেখা গেছে ১০ জনের মধ্যে ৭ জন ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে গুগল করেন। ৫০% মানুষ গুগলের তথ্য দেখে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন নিয়েও সন্দেহ করেন। ৮০% সার্চেই ভয়ংকর রোগ দেখায়: "মাথা ব্যথা" লিখলে গুগল অ্যালগরিদম সবচেয়ে সিরিয়াস কেসগুলো আগে দেখায়। কারণ ক্লিক বেশি পড়ে। ফলে সাধারণ মাইগ্রেনও "ব্রেন টিউমার" হয়ে যায়। ৩০% মানুষ ডাক্তার বদলান: গুগলের সাথে ডাক্তারের কথা না মিললে প্রতি ৩ জনের ১ জন ডাক্তার বদলে ফেলেন। বিশ্বাসের জায়গাটাই নড়ে যায়।
তাহলে দায়টা কার? ৩ দিক দেখুন গুগলের দায়: গুগল তথ্যের দোকান, ডাক্তার না। অ্যালগরিদম "ক্লিক" ধরতে সিরিয়াস রোগ আগে দেখায়। ওয়েবসাইটগুলোও ভিউ বাড়াতে টাইটেল দেয় "এই ৫টি লক্ষণ মানেই ক্যান্সার"। ভয় বিক্রি হয় বেশি। আমাদের দায়: আমরা অর্ধেক তথ্য পড়েই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। "থাইরয়েডের লক্ষণ" পড়ে নিজেই থাইরয়েড রোগী বনে যাই। টেস্ট ছাড়া, ডাক্তার ছাড়া রোগ নির্ণয় করি। ধৈর্য নেই। সিস্টেমের দায়: ডাক্তারের কাছে ৫ মিনিট সময়, লম্বা লাইন। রোগী প্রশ্ন করার সুযোগ পান না। তাই সন্দেহ মেটাতে গুগলই ভরসা। স্বাস্থ্য সচেতনতা আর ডাক্তার-রোগীর কমিউনিকেশন গ্যাপও বড় কারণ।
"ডক্টর গুগল" ব্যবহারের ৩টি সোনার নিয়ম তথ্য নিন, ডায়াগনোসিস না: গুগল থেকে রোগ বুঝুন, কিন্তু নিজে রোগী সাজবেন না। "মাথা ব্যথার ১০ কারণ" পড়ে জ্ঞান বাড়ান, কিন্তু "আমার ব্রেন টিউমার" ভাববেন না। ওয়েবসাইট দেখে বিশ্বাস করুন: random ব্লগ না পড়ে WHO, NHS, Apollo, Fortis এর মতো বিশ্বস্ত সাইট দেখুন। .gov, .org ডোমেইন বেশি ভরসার। ইউটিউব "টোটকা" এড়িয়ে চলুন।
ডাক্তারের সাথে শেয়ার করুন: গুগলে যা পড়েছেন, লজ্জা না পেয়ে ডাক্তারকে বলুন। "ডাক্তারবাবু, গুগল বলছে এটা হতে পারে" - জিজ্ঞেস করুন। ভালো ডাক্তার রেগে যাবেন না, বুঝিয়ে দেবেন। লুকোবেন না।
কখন গুগল না করে সোজা হাসপাতাল বুকের বাঁ দিকে চাপ, শ্বাসকষ্ট, কথা জড়িয়ে যাওয়া, এক দিক অবশ হয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড পেট ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া - এই লক্ষণ দেখলে ১ সেকেন্ডও নষ্ট করবেন না। গুগল বন্ধ করে ১০৮ বা কাছের হাসপাতালে যান। ইন্টারনেট এখানে কাজের না।
শেষ কথা গুগল খারাপ না, ব্যবহারের দোষ। তথ্য জানা ভালো, কিন্তু সেই তথ্য দিয়ে নিজের রোগ ধরা বিপজ্জনক। ডাক্তার ১০ বছর পড়াশোনা করে যা বোঝেন, ১০ মিনিটের সার্চে তা হয় না।
শরীর খারাপ লাগলে প্রথম কাজ - ডাক্তার। দ্বিতীয় কাজ - ডাক্তারের কথাই শেষ কথা। গুগল শুধু প্রশ্ন করার সাহস দিক, উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব ডাক্তারের হাতেই থাক।
নোট : শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না বা ইন্টারনেটের তথ্যের ওপর ভরসা করবেন না। সঠিক রোগ নির্ণয় আর চিকিৎসার জন্য রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন। এটা সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্য, চিকিৎসা না। জরুরি অবস্থায় অবিলম্বে চিকিৎসকের সাহায্য নিন।

