সবে চোখটা লেগেছে, হঠাৎ গোটা শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। মনে হল উঁচু থেকে পড়ে যাচ্ছেন বা পা পিছলে গেল। বুক ধড়ফড়, ঘুম ভেঙে চুরমার। সপ্তাহে ২-৩ বার হচ্ছে? ভয় পাচ্ছেন ব্রেনের রোগ বা হার্টের সমস্যা ভেবে? নিউরোলজিস্টরা বলছেন, একে বলে ‘হিপনিক জার্ক’ বা ‘স্লিপ স্টার্ট’। ৭০% মানুষের জীবনে কখনও না কখনও হয়।

সারাদিনের ক্লান্তিতে সবে চোখটা বুজে এসেছে। আচমকা গোটা শরীরটা বিদ্যুৎ খেলার মতো ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। ঘুম ভেঙে দেখলেন বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে খাট থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন বা সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়লেন।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

এই অভিজ্ঞতা আপনার একার নয়। একে মেডিকেলের ভাষায় বলে ‘হিপনিক জার্ক’ বা ‘স্লিপ স্টার্টস’। ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ৬০-৭০% সুস্থ মানুষেরই কখনও না কখনও এটা হয়।

কেন হয় এই ঝাঁকুনি? ব্রেনের কনফিউশন

ঘুমোনোর সময় আমাদের ব্রেন আর শরীর ধীরে ধীরে রিল্যাক্স মোডে যায়। মাসল টোন কমে, হার্ট রেট স্লো হয়, ব্রেন ওয়েভ চেঞ্জ হয়।

কিন্তু কখনও কখনও ব্রেনের ‘রেটিকুলার অ্যাক্টিভেটিং সিস্টেম’ আর ‘মোটর কন্ট্রোল সিস্টেম’-এর মধ্যে টাইমিং মিসম্যাচ হয়। ব্রেন ভাবে, আপনি পড়ে যাচ্ছেন বা বিপদে আছেন। তখনই সারভাইভাল ইন্সটিংক্ট থেকে শরীরের সব মাসলে একসাথে সিগন্যাল পাঠায় – “জাগো, ব্যালান্স করো”। ব্যাস, ঝাঁকুনি।

অনেকটা কম্পিউটার শাটডাউনের সময় হ্যাং করার মতো। সিস্টেমটা ঠিকঠাক বন্ধ হচ্ছে না।

৫টা কমন কারণ – এগুলো থাকলে জার্ক বাড়ে

১. অতিরিক্ত স্ট্রেস, অ্যাংজাইটি: সারাদিন টেনশন, ওভারথিংকিং করলে ব্রেন হাই অ্যালার্টে থাকে। ঘুমের সময় রিল্যাক্স করতে পারে না। ফলে ব্রেন ভুল সিগন্যাল দেয়। পরীক্ষা, অফিসের চাপ, ব্রেকআপের পর এটা খুব বাড়ে।

২. ঘুম কম বা অনিয়মিত ঘুম: টানা রাত জাগা, শিফট ডিউটি, ৪-৫ ঘণ্টা ঘুম – ব্রেন ক্লান্ত থাকে। জোর করে ঘুমাতে গেলে নার্ভাস সিস্টেম হাইপার-এক্সাইটেড থাকে। তখন জার্ক বেশি হয়।

৩. বেশি ক্যাফেইন ও নিকোটিন: বিকাল ৫টার পর চা, কফি, কোল্ড ড্রিংক, সিগারেট – এগুলো স্টিমুল্যান্ট। ব্রেনকে জাগিয়ে রাখে। ঘুমের মধ্যে মাসলে কন্ট্রাকশন ঘটায়। দিনে ৩ কাপের বেশি কফি খেলে রিস্ক ডবল।

৪. শরীরচর্চা রাতে করা: ঘুমের ২ ঘণ্টা আগে হেভি জিম, দৌড়ানো করলে বডি টেম্পারেচার আর অ্যাড্রিনালিন হাই থাকে। মাসল রিল্যাক্স হয় না। ফলে ঘুমের শুরুতে ঝাঁকুনি আসে।

৫. ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রনের ঘাটতি: এই মিনারেলগুলো নার্ভ ও মাসল রিল্যাক্স করতে হেল্প করে। ঘাটতি হলে মাসল নিজে থেকেই লাফিয়ে ওঠে। রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোমের সাথেও এর লিঙ্ক আছে।

কখন ভয় নেই – ৯০% কেস নরমাল

যদি মাসে ২-৪ বার হয়, ঝাঁকুনির পর আবার ঘুমিয়ে পড়েন, সকালে অন্য কোনও সমস্যা না থাকে – তাহলে চিন্তা নেই। এটা ‘বেনাইন মায়োক্লোনাস’। ব্রেনের রোগ নয়, হার্টের রোগ নয়, মৃগীর লক্ষণ নয়।

বাচ্চাদের মধ্যে এটা আরও বেশি হয়। কারণ ওদের নার্ভাস সিস্টেম ম্যাচিউর হচ্ছে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন? ৫টা রেড ফ্ল্যাগ

হিপনিক জার্ক নরমাল, কিন্তু এই সিম্পটম থাকলে নিউরোলজিস্ট দেখান:

১. রোজ রাতে একাধিকবার হচ্ছে, ঘুমাতেই পারছেন না। ইনসমনিয়া হয়ে যাচ্ছে।

২. ঝাঁকুনির সাথে দম আটকে আসা, বুক ব্যথা, ঘাম। স্লিপ অ্যাপনিয়া বা হার্টের ইস্যু হতে পারে।

৩. দিনের বেলাতেও হাত-পা কাঁপা, ব্যালান্সের সমস্যা, কথা জড়ানো। নিউরোলজিকাল ডিজের সাইন।

৪. ঝাঁকুনির সময় দাঁতে জিভ কেটে যাওয়া, হিসু বেরিয়ে যাওয়া, ২-৩ মিনিট জ্ঞান না থাকা। এটা মৃগী বা সিজার হতে পারে।

৫. শরীরের একটা দিকেই শুধু ঝাঁকুনি, বা মুখ বেঁকে যাওয়া। স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

এই ৫টা না থাকলে টেনশন করবেন না।

৭টা ঘরোয়া সমাধান – জার্ক কমান ২ সপ্তাহে

১. ক্যাফেইন কার্ফিউ: দুপুর ২টার পর চা, কফি, চকোলেট, গ্রিন টি, কোল্ড ড্রিংকস বন্ধ।

২. ম্যাগনেশিয়াম রিচ ডিনার: রাতে পালং শাক, কলা, আমন্ড, কুমড়োর বীজ খান। দরকারে ডাক্তার দেখিয়ে ম্যাগনেশিয়াম গ্লাইসিনেট সাপ্লিমেন্ট ২০০ মি.গ্রা.।

৩. ঘুমের রুটিন: রোজ এক টাইমে শুতে যান, এক টাইমে উঠুন। উইকেন্ডেও। ব্রেনের বডি ক্লক ঠিক হবে।

৪. স্ট্রেচিং ও গরম জল স্নান: ঘুমের ১ ঘণ্টা আগে হালকা স্ট্রেচিং করুন। পা, কাফ মাসল টানুন। তারপর গরম জলে পা ডুবিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। মাসল রিল্যাক্স হবে।

৫. ৪-৭-৮ ব্রিদিং: বিছানায় শুয়ে ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৮ সেকেন্ডে ছাড়ুন। ৪ বার করুন। নার্ভাস সিস্টেম শান্ত হবে।

৬. স্ক্রিন টাইম বন্ধ: ঘুমের ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ অফ। ব্লু লাইট মেলাটোনিন হরমোন কমায়, ব্রেন জেগে থাকে।

৭. ওভারথিংকিং বন্ধ: শুয়ে অফিসের চিন্তা করবেন না। ‘ওরি জার্নাল’ মেনটেন করুন। ঘুমের আগে খাতায় টেনশন লিখে ফেলুন। ব্রেন খালি হবে।

শেষ কথা:

ঘুমের মধ্যে ঝাঁকুনি মানেই ব্রেন ড্যামেজ নয়। এটা শরীরের ‘সিকিউরিটি অ্যালার্ম’ – একটু বেশি সেনসিটিভ হয়ে গেছে।

লাইফস্টাইল ঠিক করুন, স্ট্রেস কমান, কফি কমান। ৯০% কেসে ২ সপ্তাহেই কমে যাবে।

তবু যদি রোজ হয়, ঘুমের বারোটা বাজে, সাথে অন্য সিম্পটম থাকে – দেরি না করে নিউরোলজিস্ট দেখান। একটা EEG বা স্লিপ স্টাডি করিয়ে নিলেই নিশ্চিন্ত।

কারণ ভালো ঘুম মানেই ভালো স্বাস্থ্য। আর আচমকা ঝাঁকুনি যেন সেই ঘুমের শত্রু না হয়