পৃথিবী বদলাতে হলে ক্লাসরুম নয়, ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। ছেলে-মেয়ে উভয় সন্তানকেই ছোট থেকে শেখাতে হবে নারীর সম্মান মানে কী। ভয় দেখিয়ে নয়, দৈনন্দিন আচরণ দিয়েই একটা নিরাপদ পৃথিবী গড়া যায়।
মেয়েরা রাত করে বাড়ি ফিরবে না..একা বেরিও না, ওড়না ঠিক করো। ছোট থেকে আমরা মেয়েদের শেখাই কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে। কীভাবে চারপাশের বিপদ এড়াতে হবে। কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখেছি, বিপদটা তৈরি হচ্ছে কোথা থেকে? সত্যিকারের বদল তখনই আসবে যখন আমরা মেয়েদের "সাবধান" হওয়া শেখানোর পাশাপাশি ছেলেদের "ভদ্র" হওয়া শেখাবো। এ পৃথিবী তখনই নারীর বাসযোগ্য হবে, যখন সম্মানটা সিলেবাসে নয়, সংসারে পাঠ্য হবে। আর সেই পাঠটা শুরু হয় একদম ছোটবেলা থেকে।

সবচেয়ে প্রথমে সন্তানকে শেখাতে হবে "না" মানে "না"। এটাই Consent এর প্রথম পাঠ। আপনার ৫ বছরের ছেলে যদি বলে "আমি কাকুকে জড়িয়ে ধরব না", তাহলে জোর করে "যা কাকুকে আদর কর" বলবেন না। ছোট ছোট জিনিস থেকেই সে শেখে নিজের শরীরের ওপর তার অধিকার আছে। আবার অন্যের শরীর ছোঁয়ার আগে অনুমতি নিতে হয়। "দিদির খেলনা নেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছ?" "বন্ধুকে জড়িয়ে ধরার আগে জিজ্ঞেস করেছ ওর ভালো লাগবে কিনা?" এই প্রশ্নগুলোই বড় হয়ে "না" শব্দটাকে সম্মান করতে শেখায়।
এরপর শেখাতে হবে কাজের কোনো লিঙ্গ হয় না। "রান্না মেয়েদের কাজ" আর "গাড়ি সারানো ছেলেদের কাজ" - এই লাইন দুটো বাড়ি থেকে মুছে ফেলুন। ছেলেকে ঝাঁট দিতে, ভাত রাঁধতে, নিজের জামা কাচতে শেখান। মেয়েকে পেরেক ঠুকতে, ব্যাংকের কাজ বুঝতে, সাইকেলের চেন লাগাতে শেখান। যখন ঘরের সব কাজ সবাই মিলে করবে, তখন "তুমি ছোট আমি বড়" এই ভাবনাটাই মনে আসবে না। সম্মান আর সমানাধিকার একসাথে বড় হবে।
তৃতীয় পাঠ হল শরীর নিয়ে ঠাট্টা বা কটূক্তি নয়। "মোটা", "কালো", "লম্বা", "বয়স হয়ে গেছে" - বড়রা আড্ডায় এই কথাগুলো বললে বাচ্চারাও সেটাই শেখে। শরীর নিয়ে কাউকে খোঁচা দেওয়া, রাস্তায় কাউকে নিয়ে মন্তব্য করা যে কত বড় অপরাধ, সেটা গল্পের ছলে বোঝান। ওকে শেখান, "আমরা কারো পোশাক নিয়ে কথা বলব না, আমরা তার কাজ, তার ব্যবহার নিয়ে কথা বলব"। সৌন্দর্যের সংজ্ঞা একটা নয়, এটা বোঝান।
চতুর্থত, মা, দিদি, শিক্ষিকাকে যেন কাজের লোক না ভাবে। "মা, জল দাও", "দিদি, আমার খাতা এনে দে", "ম্যাডাম, এটা করে দিন" - এই অর্ডার দেওয়ার অভ্যাসটা ছোট থেকেই তৈরি হয়। বদলে "মা, একটু জল দেবে? ধন্যবাদ" - এই কৃতজ্ঞতা শেখান। বাড়ির মহিলারা শুধু রাঁধে-বাড়ে না। তাদেরও অফিস আছে, স্বপ্ন আছে, ক্লান্তি আছে। ছেলে-মেয়ে উভয়কেই এটা বুঝতে শেখান। মাকে কাজে সাহায্য করা "হেল্প" নয়, এটা দায়িত্ব।
পঞ্চম পাঠ হল ছেলেদেরও কাঁদতে দেওয়া, আবেগ বুঝতে শেখানো। "ছেলেরা কাঁদে না", "পুরুষ মানুষের মতো শক্ত হও" - এই একটা লাইন ছোট ছেলেদের মনকে পাথর করে দেয়। যে কষ্ট চেপে রাখে, বড় হয়ে সেই রাগ অন্যের ওপর ঝাড়ে। তাই সন্তানকে কাঁদতে দিন। ভয় পেলে "ভয় পেয়েছি" বলতে শেখান। "আমার সাহায্য লাগবে" বলতে শেখান। যে নিজের আবেগ বোঝে, সে অন্যের কষ্টও বোঝে। আর যে অন্যের কষ্ট বোঝে, সে কখনো অসম্মান করতে পারে না।
ষষ্ঠ পাঠ হল ইতিহাসের পাতা। ঘুমপাড়ানি গল্পে শুধু রাজপুত্র আর যোদ্ধা নয়। লক্ষ্মীবাই, কল্পনা চাওলা, মাদার টেরেসা, বেগম রোকেয়া - এদের গল্পও বলুন। মেয়েরা শুধু "নায়িকার বান্ধবী" বা "সাহায্যকারী" নয়। তারাও নেতা, বিজ্ঞানী, খেলোয়াড়, যোদ্ধা হতে পারে। ছেলে-মেয়ে উভয়কেই এই রোল মডেলগুলো দেখান। তাহলে মাথায় "ছেলে-মেয়ে" ভাগটা থাকবে না।
আর সবচেয়ে বড় পাঠ হল আপনি নিজে উদাহরণ হওয়া। সব লেকচারের ওপরে হল আপনার আচরণ। আপনি আপনার স্ত্রীকে কীভাবে কথা বলেন, অফিসের মহিলা কলিগকে কীভাবে ট্রিট করেন, রাস্তায় কাউকে দেখে কী মন্তব্য করেন, টিভিতে নারীদের নিয়ে কী বলেন - বাচ্চা সব নোট করে। মুখে ১০টা ভালো কথা বলার থেকে আপনার ১টা সম্মানজনক ব্যবহার ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী।
পৃথিবী বদলাবে একদিনে নয়। কিন্তু আপনার বাড়ি থেকে শুরু হতে পারে। মেয়েদের "নিজেকে বাঁচাও" বলার সাথে ছেলেদের "অন্যকে সম্মান করো" বলতে হবে। সম্মান কোনো বড় বক্তৃতা নয়। এটা রোজকার ছোট ছোট অভ্যাস। আজ রাতে খাওয়ার টেবিলে সন্তানকে শুধু একটা প্রশ্ন করুন - "আজ তুমি কাকে সাহায্য করেছ? কাকে ধন্যবাদ দিয়েছ?"


