রোজ ডাল-ভাত খেয়ে একঘেয়ে? পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া নিরামিষ রান্নায় নতুন স্বাদ চাইছেন? তাহলে বানান ওড়িশার ‘জাতীয় তরকারি’ ডালমা। অরহর ডাল আর ৭-৮ রকম সবজি, সাথে পাঁচ ফোড়ন আর ঘি-এর ফোড়ন – পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদেও এই ডালমা থাকে। প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিনে ঠাসা। বাচ্চা থেকে বুড়ো সবাই খেতে পারবে। 

বাঙালির ডাল মানেই মুসুরির পাতলা ডাল বা সোনামুগের ভাজা ডাল। কিন্তু ওড়িশায় গেলে দেখবেন, ডাল মানেই ‘ডালমা’। শুধু ডাল নয়, এটা ডাল + সবজির কমপ্লিট মিল।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে ‘ছাপ্পান্ন ভোগ’-এর অন্যতম প্রধান পদ এই ডালমা। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া, সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক রান্না। তাই নিরামিষ দিনে, ব্রতের দিনে, বা পেট গরম হলে বাঙালির পাতে ডালমা হিট।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, ডালমা হল ‘ওয়ান পট নিউট্রিশন বম্ব’। ডালে প্রোটিন, সবজিতে ভিটামিন-মিনারেল, ঘিয়ে গুড ফ্যাট, আদা-জিরেয় হজমি গুণ। আর স্বাদ? একবার খেলে মুগ-মুসুরি ভুলে যাবেন।

ডালমা বানাতে কী কী লাগবে জানুন:

ডাল: অরহর/তুর ডাল – ১ কাপ। মুগ ডাল দিয়েও হয়, তবে অরহরই অথেন্টিক।

সবজি: ২ কাপ মিক্সড। আলু ১টা, কুমড়ো ১০০ গ্রাম, কাঁচকলা ১টা, পেঁপে ১০০ গ্রাম, বেগুন ১টা, বিনস ৫০ গ্রাম, গাজর ১টা, থোর/ডাঁটা থাকলে দিন। মোট ৭-৮ রকম।

ফোড়ন: ঘি ২ চামচ, শুকনো লঙ্কা ২টো, তেজপাতা ১টা, পাঁচ ফোড়ন ১ চামচ, হিং ১ চিমটি।

বাটা মশলা: আদা ১ ইঞ্চি, জিরে ১ চামচ, শুকনো লঙ্কা ১টা – একসাথে বেটে নিন।

আরও: নুন স্বাদমতো, হলুদ ১/২ চামচ, চিনি ১/২ চামচ, ধনেপাতা, ভাজা জিরে গুঁড়ো ১ চামচ, নারকেল কোরা ২ চামচ – অপশনাল।

অথেন্টিক ডালমা রান্নার পদ্ধতি – স্টেপ বাই স্টেপ

ধাপ ১: ডাল-সবজি সেদ্ধ

ডাল ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। প্রেসার কুকারে ডাল, সব সবজি বড় টুকরো করে কাটা, নুন, হলুদ, ৩ কাপ জল দিন। ২টো সিটি দিন। সবজি গলে যাবে না, আবার কাঁচাও থাকবে না। কুকার না থাকলে কড়াইতে ২০ মিনিট ঢাকা দিয়ে সেদ্ধ করুন।

ধাপ ২: মশলা কষানো – টুইস্ট এখানেই

কড়াইতে ১ চামচ ঘি গরম করুন। আদা-জিরে-শুকনো লঙ্কা বাটা দিয়ে ১ মিনিট কম আঁচে কষান। কাঁচা গন্ধ গেলে সেদ্ধ ডাল-সবজি ঢেলে দিন। চিনি দিন। ৫ মিনিট ফুটান। ঘনত্ব নিজের পছন্দ মতো রাখুন। জগন্নাথ মন্দিরের ডালমা একটু ঘন হয়।

ধাপ ৩: ঘি-পাঁচ ফোড়নের ফাইনাল ফোড়ন

ছোট কড়াইতে ১ চামচ ঘি গরম করুন। শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা, পাঁচ ফোড়ন, হিং দিন। ফোড়ন চড়বড় করলে ডালের উপর ঢেলে দিন। সাথে সাথে ঢাকা দিন। ২ মিনিট দমে রাখুন।

ধাপ ৪: ফিনিশিং

উপরে ভাজা জিরে গুঁড়ো, ধনেপাতা কুচি, নারকেল কোরা ছড়িয়ে দিন। ব্যস, ওড়িশার ডালমা রেডি।

ডালমার ৫টা সিক্রেট টিপস – যা রেস্টুরেন্টও বলে না:

১. সবজি বড় টুকরো: ছোট করলে গলে যাবে। ২ ইঞ্চি সাইজ বেস্ট। ডালমা চটকানো হবে না।

২. কাঁচকলা মাস্ট: কাঁচকলা ডালমাকে ক্রিমি টেক্সচার দেয় আর গ্যাস হতে দেয় না। না পেলে পেঁপে ডবল দিন।

৩. চিনি কেন: ১ চিমটি চিনি সবজির টক ভাব কাটায়, স্বাদ ব্যালেন্স করে। ওড়িশার রান্নায় হালকা মিষ্টি থাকে।

৪. ঘি-এর ফোড়ন শেষে: আগে দিলে গন্ধ মরে যাবে। নামানোর ঠিক আগে ফোড়ন দিন।

৫. নারকেল কোরা: অথেন্টিক ডালমায় নারকেল কোরা দেওয়া হয়। স্বাদ ১০ গুণ বাড়ে।

কেন রোজকার ডালের থেকে ডালমা বেটার?

১. কমপ্লিট প্রোটিন: ডাল + কুমড়ো/বিনস মিলে সব অ্যামিনো অ্যাসিড পাবেন। ভাত-রুটি ছাড়াও চলবে।

২. জিরো অ্যাসিডিটি: পেঁয়াজ-রসুন নেই, হিং-আদা-জিরে আছে। পেট ঠান্ডা রাখে। গ্যাসের রোগীর জন্য আশীর্বাদ।

৩. বাচ্চার টিফিন: ১ বাটি ডালমা + ১টা রুটি = কমপ্লিট লাঞ্চ। সবজি বেছে খাবে না, গলা দিয়ে নেমে যাবে।

৪. ওজন কমায়: ফাইবার হাই, ক্যালরি কম। ১ বাটি মাত্র ১২০ ক্যালরি। পেট ভরা থাকবে ৩ ঘণ্টা।

৫. ডায়াবেটিস ফ্রেন্ডলি: লো GI। সুগার স্পাইক করে না। চিনি স্কিপ করুন।

কী দিয়ে খাবেন ডালমা?

১. গরম ভাত: বেস্ট কম্বো। উপরে একটু ঘি দিন। লেবু কচলে নিন।

২. রুটি/পরোটা: রুটি দিয়ে ডালমা মেখে খান। পাঞ্জাবি ডাল-ফ্রাই ফেল।

৩. মুড়ি: ওড়িশায় বিকালে মুড়ি-ডালমা খায়। হেলদি স্ন্যাক্স।

৪. লুচি: ব্রতের দিন লুচি-ডালমা। পেঁয়াজ-রসুন নেই বলে সবাই খেতে পারবে।

৩টে ভ্যারিয়েশন ট্রাই করুন:

১. আম্বিল ডালমা: টমেটো বা আমচুর দিয়ে টক ডালমা। গরমে দারুণ।

২. ঘাড়া ডালমা: ডাল কম, সবজি বেশি। সবজি খাওয়ার টেস্টি উপায়।

৩. মুগ ডালমা: অরহর না পেলে সোনামুগ ডাল দিয়ে। হালকা, ব্রতের জন্য বেস্ট।

শেষ কথা:

নিরামিষ মানেই পনির বা ধোঁকার ডালনা নয়। ওড়িশার ঘরে ঘরে ডালমা হয়, কারণ এটা সস্তা, পুষ্টিকর, আর টেস্টি। ১ কাপ ডাল + ঘরের সবজি দিয়ে ৪ জনের ফুল মিল।

আজই ট্রাই করুন। খিচুড়ির দিন শেষ, ডালমার বাংলাদেশ। থুড়ি, ওড়িশা। একবার খেলে বাঙালির পাতেও জায়গা করে নেবে এই ‘মহাপ্রসাদ’।