‘আমার বাচ্চা এখনো ছোট’—এই ভেবেই আমরা অনেক কথা এড়িয়ে যাই। সেক্স, পিরিয়ড, বুলিং, ড্রাগ, মানসিক অবসাদ—এগুলো নিয়ে বাড়িতে আলোচনা হয় না। ফল? বাচ্চা গুগল, বন্ধু বা পর্ন থেকে ভুল শেখে। লজ্জা, ভয় বা ‘সময় হয়নি’ বলে চুপ থাকলে বিপদ বাড়ে। 

Parenting Tips: ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে। ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দরজা বন্ধ করে থাকা, হঠাৎ মুড সুইং। আমরা ভাবি ‘বয়সের দোষ’। কিন্তু ওদের মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘোরে—শরীর নিয়ে, সম্পর্ক নিয়ে, ইন্টারনেটের দুনিয়া নিয়ে। উত্তর না পেলে ওরা নিজের মতো ধরে নেয়। আর সেটাই ডেকে আনে সর্বনাশ। ইউটিউব, ইনস্টা, বন্ধুদের গ্রুপ—সব জায়গায় অর্ধেক তথ্য, ভুল মেসেজ। মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ওদের ফিল্টার হওয়া। লজ্জা ঝেড়ে ফেলে, বন্ধুর মতো পাশে বসে এই ৫টা কথা বলতেই হবে। না হলে পরে আফসোস করে লাভ নেই।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

গুড টাচ, ব্যাড টাচ আর শরীরের গোপনীয়তা:

৩ বছর বয়স থেকেই শুরু করুন। ‘প্রাইভেট পার্টস’ মানে কী বোঝান। বলুন, যে জায়গাগুলো সাঁতারের পোশাকে ঢাকা থাকে, সেখানে মা-বাবা, ডাক্তার আর যে নাইটি পরায় সে ছাড়া কেউ হাত দেবে না। ‘গুড টাচ’ হল মাথায় হাত, পিঠ চাপড়ানো। ‘ব্যাড টাচ’ হল কেউ প্রাইভেট পার্টে হাত দিলে, জোর করলে, সিক্রেট রাখতে বললে। বাচ্চাকে শেখান ‘না’ বলতে, চিৎকার করতে, দৌড়ে পালিয়ে এসে আপনাকে বলতে। কখনও বকবেন না। বিশ্বাস করুন। ৯০% কেসে চেনা লোকই অ্যাবিউজ করে। তাই ‘কাকু ভালো’ বলে ছেড়ে দেবেন না। প্রতি ৬ মাসে একবার রিমাইন্ডার দিন।

পিরিয়ড, শারীরিক পরিবর্তন আর সেক্স এডুকেশন:

মেয়ের ৮ বছর আর ছেলের ১০ বছর হতেই শরীর বদলায়। মেয়েকে পিরিয়ড নিয়ে আগে থেকে বলুন। হঠাৎ রক্ত দেখে ভয় পেয়ে যায় অনেকে। কী হয়, কেন হয়, প্যাড কীভাবে ইউজ করে দেখিয়ে দিন। এটা লজ্জার না, নর্মাল। ছেলেদের ভয়েস চেঞ্জ, স্বপ্নদোষ নিয়ে বলুন। ১২-১৩ বছর বয়সে সেক্স নিয়ে বেসিক কথা বলুন। পর্ন না, বায়োলজি বোঝান। কনসেন্ট মানে কী, প্রেগন্যান্সি কীভাবে হয়, প্রোটেকশন কেন জরুরি—লুকোবেন না। আপনি না বললে ওরা পর্ন দেখে শিখবে, আর সেটা ভায়োলেন্ট, অবাস্তব। বই, ভিডিওর সাহায্য নিন। বলুন, ‘কিছু জানতে চাইলে আমাকে জিজ্ঞেস করবি, আমি বকব না’।

মানসিক স্বাস্থ্য, মন খারাপ আর সুইসাইডাল থট:

‘এতটুকু বয়সে আবার ডিপ্রেশন কীসের’—এটা বলা বন্ধ করুন। বোর্ডের চাপ, বুলিং, ব্রেকআপ, বডি শেমিং—টিনএজারদের স্ট্রেস লেভেল মারাত্মক। রেজাল্ট খারাপ হলে মারধর, তুলনা করা বন্ধ করুন। রোজ ১০ মিনিট জিজ্ঞেস করুন, ‘আজ মন কেমন ছিল’। কান্না পেলে কাঁদতে দিন। ‘ছেলেদের কাঁদতে নেই’ বলবেন না। যদি দেখেন বাচ্চা ঘর থেকে বেরোয় না, খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, মরে যাওয়ার কথা বলে—সিরিয়াসলি নিন। সরাসরি জিজ্ঞেস করুন, ‘তোর কি নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করে’? ভুল ধারণা যে এটা জিজ্ঞেস করলে ওরা সুইসাইড করবে। উল্টো, কথা বললে হালকা লাগে। দরকারে সাইকোলজিস্টের কাছে যান। লুকোবেন না।

ইন্টারনেট, সাইবার বুলিং আর অনলাইন প্রাইভেসি:

ফোন হাতে দিয়েই দায়িত্ব শেষ না। ইন্টারনেট মানে খোলা রাস্তা। যে কেউ আসতে পারে। বাচ্চাকে শেখান—১. আসল নাম, স্কুল, ঠিকানা, ফোন নম্বর কাউকে দেবে না। ২. অচেনা লোকের রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করবে না। ৩. কেউ ন্যুড চাইলে, ভয় দেখালে স্ক্রিনশট নিয়ে আপনাকে বলবে। ৪. সাইবার বুলিং হলে ব্লক করবে, রিপোর্ট করবে। ৫. ‘মোমো চ্যালেঞ্জ’, ‘ব্লু হোয়েল’ টাইপ গেমে ক্লিক করবে না। ফোনে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অন রাখুন। রাতে ফোন নিজের কাছে রাখুন। সপ্তাহে একদিন ওর সাথে বসে ফোন ঘাঁটুন। বিশ্বাস রাখুন, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস না।

ড্রাগ, সিগারেট, অ্যালকোহল আর ‘না’ বলার সাহস:

ক্লাস ৮-৯ থেকেই বন্ধুরা অফার করে—‘এক টান দে, কিচ্ছু হবে না’। আপনি না বললে ও ভাববে নর্মাল। সন্তানকে ড্রাগের টাইপ, ক্ষতি নিয়ে সায়েন্টিফিক ভাবে বলুন। ইউটিউবে রিহ্যাবের ভিডিও দেখান। ভয় দেখাবেন না, ফ্যাক্ট দিন। সবচেয়ে জরুরি ‘পিয়ার প্রেশার’ হ্যান্ডেল করা শেখানো। রোল-প্লে করুন। বন্ধু জোর করলে কী বলবে প্র্যাকটিস করান—‘না রে, আমার অ্যাজমা আছে’, ‘বাড়িতে টের পেলে বাবা মেরে ফেলবে’, ‘আমার ভালো লাগে না’। ওকে বিশ্বাস দিন যে ও ‘না’ বললে আপনি গর্বিত হবেন, বকবেন না। বাড়িতে যদি আপনি স্মোক বা ড্রিঙ্ক করেন, ওর সামনে করবেন না। বাচ্চারা দেখে শেখে।

লজ্জা, সংস্কার, ‘লোকে কী বলবে’—এসব ভেবে চুপ থাকলে বাচ্চার ক্ষতি। ওরা আপনার পেট থেকে বেরোলেও এই দুনিয়াটা আলাদা। এখানে খারাপ লোক আছে, খারাপ কন্টেন্ট আছে। আপনার একটা কথাই ওকে বাঁচাতে পারে। আজই সময় বের করুন। ফোন সরিয়ে রাখুন। পাশে বসুন। বলুন, ‘তোর সাথে কিছু জরুরি কথা আছে। তুই আমার বন্ধু, সব বলতে পারিস’। প্রথমে অস্বস্তি হবে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই আলোচনাগুলোই ওকে স্ট্রং, স্মার্ট আর সেফ বানাবে।