হাঁটু, কোমর, আঙুলের গাঁটে ব্যথায় কাবু? পেইনকিলার খেয়ে খেয়ে গ্যাস-অম্বল? এবার রান্নাঘরের জাফরানই হতে পারে আপনার নতুন ওষুধ। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, জাফরানের মধ্যে থাকা ক্রোসিন, স্যাফরানালের মতো কম্পাউন্ড আর্থ্রাইটিসের ইনফ্লেমেশন কমায়
সকালবেলা বিছানা থেকে নামতে গেলেই হাঁটুতে খটখট, আঙুল মুঠো করতে গেলেই যন্ত্রণা। আর্থ্রাইটিসের ব্যথা যাদের আছে, তারা জানে এটা কতটা কষ্টের। মাসের পর মাস পেইনকিলার, ফিজিওথেরাপি, তেল মালিশ – তাও পুরো আরাম নেই। এবার সুখবর দিচ্ছেন ইরান ও ইতালির বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি, দামি জাফরান শুধু বিরিয়ানি বা পায়েসের জন্য নয়, আর্থ্রাইটিসের “ন্যাচারাল পেইনকিলার”।
*জাফরান কীভাবে ব্যথা কমায়? বিজ্ঞান কী বলছে?*
*১. ইনফ্লেমেশন বা প্রদাহের শত্রু:*
আর্থ্রাইটিস মানেই জয়েন্টে ইনফ্লেমেশন। জাফরানের মূল কম্পাউন্ড ‘ক্রোসিন’ আর ‘স্যাফরানাল’ শরীরে TNF-α, IL-6 এর মতো ইনফ্লেমেটরি মার্কার কমিয়ে দেয়। _Journal of Complementary Medicine_ এর স্টাডিতে দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ রোজ ৩০ মিলিগ্রাম জাফরান খেয়ে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগীদের ব্যথা ৩৫% কমেছে, সকালের স্টিফনেস কমেছে ৫০%।
*২. পেইনকিলারের মতো কাজ, সাইড এফেক্ট নেই:*
ইরানের Mashhad University ৬০ জন অস্টিওআর্থ্রাইটিস রোগীর উপর ট্রায়াল করে। এক দলকে দিনে ১০০ মিলিগ্রাম ইবুপ্রোফেন, অন্য দলকে ৩০ মিলিগ্রাম জাফরান দেওয়া হয় ৮ সপ্তাহ।
ফলাফল: দুই দলের ব্যথাই সমান কমেছে। কিন্তু ইবুপ্রোফেন গ্রুপের গ্যাস, বমি, কিডনির সমস্যা হয়েছে। জাফরান গ্রুপে কোনো সাইড এফেক্ট নেই।
*৩. কার্টিলেজ ক্ষয় আটকায়:*
বয়স বাড়লে জয়েন্টের কার্টিলেজ ক্ষয়ে যায়, হাড়ে হাড়ে ঘষা লেগে ব্যথা হয়। জাফরানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ‘কেম্পফেরল’ কার্টিলেজ ভাঙা আটকায়। ইঁদুরের উপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, জাফরান খেলে জয়েন্টের কুশন নষ্ট হওয়ার রেট ৪০% স্লো হয়ে যায়।
*৪. মুড ভালো করে, ব্যথা ভুলিয়ে দেয়:*
ক্রনিক ব্যথায় ডিপ্রেশন, ঘুমের সমস্যা হয়। জাফরানকে বলে ‘সানশাইন স্পাইস’। এটা সেরোটোনিন হরমোন বাড়ায়। ব্যথার অনুভূতি কম লাগে, ঘুম ভালো হয়। ব্যথা + মন খারাপ – দুটোই কভার করে।
*কোন আর্থ্রাইটিসে বেশি কাজ দেবে?*
*১. অস্টিওআর্থ্রাইটিস:* বয়সজনিত হাঁটু, কোমরের ক্ষয়। জাফরান কার্টিলেজ বাঁচায়, ব্যথা কমায়।
*২. রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস:* অটোইমিউন ডিজ, সকালে গাঁট শক্ত। জাফরান ইমিউন সিস্টেমের ওভার-রিয়্যাকশন কমায়।
*৩. গাউট:* ইউরিক অ্যাসিডের জন্য আঙুলে ব্যথা। জাফরান ইউরিক অ্যাসিড ক্রিস্টাল জমতে বাধা দেয়।
*কীভাবে খাবেন জাফরান? ডোজ কত?*
বিজ্ঞানীরা বলছেন, দিনে ২০-৩০ মিলিগ্রাম জাফরানই যথেষ্ট। মানে ১০-১৫টা জাফরানের রোঁয়া।
*১. জাফরান দুধ:* রাতে ১ গ্লাস গরম দুধে ৫-৭টা জাফরান ১০ মিনিট ভিজিয়ে খান। সাথে এক চিমটে হলুদ দিলে ডাবল বেনিফিট।
*২. জাফরান জল:* ১ কাপ গরম জলে ৪-৫টা জাফরান ভিজিয়ে সকালে খালি পেটে খান।
*৩. সাপ্লিমেন্ট:* ৩০ মিলিগ্রামের জাফরান এক্সট্র্যাক্ট ক্যাপসুল পাওয়া যায়। তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খাবেন।
*সতর্কতা: কারা খাবেন না?*
১. প্রেগন্যান্ট মহিলারা বেশি ডোজ খাবেন না, মিসক্যারেজের রিস্ক থাকে। ৫টার বেশি রোঁয়া নয়।
২. লো প্রেশারের রোগী সাবধান, জাফরান প্রেশার আরও কমাতে পারে।
৩. সার্জারির ২ সপ্তাহ আগে বন্ধ করুন, রক্ত পাতলা করে।
৪. দিনে ৫ গ্রামের বেশি খেলে বমি, মাথা ঘোরা, এমনকি টক্সিসিটি হতে পারে। মনে রাখবেন, ১ গ্রাম জাফরান = ৪৫০-৫০০টা রোঁয়া। আপনি খাচ্ছেন ১৫টা, তাই ভয় নেই।
জাফরান কোনো ম্যাজিক নয় যে একদিনে ব্যথা উধাও হবে। কিন্তু রোজের ডায়েটে রাখলে ৬-৮ সপ্তাহে ফারাক বুঝবেন। ওষুধের পাশাপাশি এটা ‘সাপোর্টিভ থেরাপি’। ওষুধ বন্ধ করবেন না নিজে নিজে। আগে ডাক্তার বা রিউমাটোলজিস্টের সাথে কথা বলুন, তারপর শুরু করুন।
১ গ্রাম জাফরানের দাম ৩০০-৫০০ টাকা। কিন্তু মাসে লাগবে ১ গ্রামেরও কম। পেইনকিলারের মাসের খরচ আর সাইড এফেক্টের হিসেব করলে, এটা সস্তাই।
ব্যথা কমলে হাঁটবেন, হাঁটলে শরীর ভালো থাকবে। তাই আজই ট্রাই করুন এই সোনালি দাওয়াই।


