হঠাৎ মাথা ঘোরা, মনে হচ্ছে চারপাশ ঘুরছে, কানে তালা লেগে যাওয়া বা শোঁ শোঁ শব্দ, এগুলোকে কি আপনি গ্যাস, দুর্বলতা বা প্রেসার ভেবে এড়িয়ে যাচ্ছেন? সাবধান! এটি ভার্টিগো হতে পারে, যা ভেতরে ভেতরে কানের ও মস্তিষ্কের বড় ক্ষতির সংকেত। জানুন কখন ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে।
অনেকেরই সকালে ঘুম থেকে উঠে বা হঠাৎ মাথা ঘুরিয়ে বসার সময় মনে হয়, পুরো ঘরটা ঘুরছে, নিজে পড়ে যাচ্ছেন। সাথে কানে তালা লাগা, কানে শোঁ শোঁ শব্দ (Tinnitus) বা বমি বমি ভাব। আমরা বেশিরভাগ সময় ভাবি, "রাতে ঘুম হয়নি", "গ্যাস হয়েছে", "দুর্বলতা থেকে হচ্ছে"। কিন্তু বারবার এমন হলে এটি সাধারণ দুর্বলতা নয়, এটি হলো ভার্টিগো। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে এটি শ্রবণশক্তি পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে।
ভার্টিগো আসলে কী? মাথা ঘোরার সাথে এর তফাৎ কী?
সাধারণ মাথা ঘোরা হলো মাথা হালকা লাগা বা টলমল করা। কিন্তু ভার্টিগোতে রোগীর মনে হয়, তিনি নিজে ঘুরছেন বা তার চারপাশের জগৎ বনবন করে ঘুরছে। এর উৎস কিন্তু মাথায় নয়, কানের ভেতরে।
আমাদের কানের ভেতরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে - শোনার জন্য Cochlea এবং শরীরের ব্যালেন্স বা ভারসাম্য রক্ষার জন্য Vestibular System। এই Vestibular System-এ কোনো সমস্যা হলেই ভার্টিগো হয়। তাই এর সাথে কানের সমস্যা জুড়ে থাকে।
কেন হয় ভার্টিগো? ৪টি প্রধান কারণ:
১. BPPV - সবচেয়ে সাধারণ কারণ (৯০% ক্ষেত্রে):
কানের ভেতরে ক্যালসিয়ামের ছোট ছোট দানা থাকে, যা আমাদের ব্যালেন্স বজায় রাখে। কোনো কারণে সেই দানা তার জায়গা থেকে সরে Semicircular Canal-এ ঢুকে গেলে, মাথা ঘোরালেই তীব্রভাবে মাথা ঘোরা শুরু হয়, ২০-৩০ সেকেন্ড থাকে, আবার ঠিক হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে, মাথা ঘুরিয়ে বা উপরে তাকালে বেশি হয়।
২. কানে জল বা ইনফেকশন (Labyrinthitis):
ঠান্ডা লেগে কানের ভেতরে ভাইরাল ইনফেকশন হলে Vestibular Nerve ফুলে যায়। তখন একটানা ২-৩ ঘণ্টা বা সারাদিন ধরে মাথা ঘোরা, সাথে কানে তালা ও শোঁ শোঁ শব্দ হয়।
৩. মেনিয়ার্স ডিজিজ - সবচেয়ে বিপজ্জনক:
কানের ভেতরে জলের চাপ বেড়ে গেলে এই রোগ হয়। এর তিনটি লক্ষণ একসাথে দেখা যায় - তীব্র মাথা ঘোরা (২০ মিনিট থেকে ১২ ঘণ্টা), কানে তালা ও শোঁ শোঁ শব্দ, এবং ধীরে ধীরে শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া। বারবার হলে এটি স্থায়ীভাবে কানে শোনার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়।
৪. মস্তিষ্কের কারণ:
যদি মাথা ঘোরার সাথে কথা জড়িয়ে যাওয়া, হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া বা চোখে ঝাপসা দেখা যায়, তাহলে এটি ব্রেইনের সমস্যা, যেমন স্ট্রোক বা মাইগ্রেন থেকেও হতে পারে।
কখনই অবহেলা করবেন না - এই ৫টি বিপদ সংকেত:
- মাথা ঘোরার সাথে কানে তালা লাগা বা শোঁ শোঁ শব্দ বাড়ছে
- এক কানে শোনা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে
- মাথা ঘোরার সাথে বমি, ঘাম হওয়া এবং হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাওয়া
- দিনে ৩-৪ বারের বেশি ঘুরছে এবং প্রতিবার ১ মিনিটের বেশি থাকছে
- মাথা ঘোরার সাথে বুকে ব্যথা, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
কী করবেন? ঘরোয়া উপায় ও চিকিৎসা:
বারবার মাথা ঘুরলে নিজে থেকে Vertin বা Stugeron খাবেন না। কারণ না জেনে ওষুধ খেলে রোগ চাপা পড়ে যায়।
১. ডাক্তার দেখান: প্রথমে একজন ENT বা নিউরোলজিস্টের কাছে যান। তারা Dix-Hallpike Test এবং অডিওমেট্রি টেস্ট করে কারণ বের করবেন।
২. BPPV হলে: কোনো ওষুধ নয়, Epley Maneuver নামে একটি বিশেষ ব্যায়ামের মাধ্যমে মাথা ঘুরিয়ে কানের দানাকে আবার জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়, ৫ মিনিটেই রোগী সুস্থ হয়ে যান।
৩. মেনিয়ার্স হলে: নুন কম খাওয়া, কফি-ধূমপান বন্ধ এবং কানের জলের চাপ কমানোর ওষুধ দিতে হয়।
৪. জল খান: ডিহাইড্রেশন থেকেও মাথা ঘোরে, তাই দিনে ৩ লিটার জল খান এবং হঠাৎ করে মাথা ঝাঁকাবেন না।
মাথা ঘোরা কোনো সাধারণ দুর্বলতা নয়, এটি আপনার শরীরের ব্যালেন্স সিস্টেমের SOS সংকেত। তাই এড়িয়ে না গিয়ে আজই কারণটা জানুন।
