জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি। শাশুড়ি জামাইকে বসিয়ে তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করছেন আর মুখে “ষাট ষাট ষাট”। এটা শুধু আদর নয়। লোকবিশ্বাস বলে এই পাখা আর ধ্বনি দিয়ে অশুভ নজর, রোগ-ব্যাধি তাড়ানো হয়।
জ্যৈষ্ঠ মাস এলেই বাঙালি বাড়িতে সাজো সাজো রব। নতুন জামাই, ইলিশ-চিংড়ি, আর শাশুড়ির হাতে তালপাতার পাখা। কিন্তু কেন শুধু জামাই ষষ্ঠীতেই এই পাখা? আর “ষাট ষাট ষাট” বলার মানেই বা কী?

গল্প ১: পৌরাণিক - দেবী ষষ্ঠীর আশীর্বাদ লোককথা বলে, দেবী ষষ্ঠী হলেন সন্তান-সন্ততির রক্ষাকর্ত্রী। জ্যৈষ্ঠ মাসে তিনি জগৎ পরিদর্শনে বেরোন। তাই এই তিথিতে মায়েরা ছেলে-মেয়ে-জামাইয়ের মঙ্গল কামনায় পুজো দেন।
তালপাতার পাখা কেন? একসময় গ্রামে তালগাছ ছিল ‘কল্পতরু’। তালপাতা দিয়ে তৈরি পাখা শীতল হাওয়া দেয়, রোদের তাপ-ঘাম তাড়ায়। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে জামাইকে বসিয়ে শাশুড়ি হাওয়া করতেন - এটা ছিল স্নেহের প্রতীক। পরে সেটাই রীতি হয়ে গেল।
গল্প ২: লৌকিক - ‘নজর লাগা’ ঠেকানোর টোটকা “ষাট ষাট ষাট” - এই তিনবার বলার মানে কী? বাঙালির বিশ্বাস, তিনবার বললে অশুভ শক্তি কেটে যায়।
পুরোনো দিনের মানুষ বলতেন: জামাই বাড়িতে এলে সবাই তাকে দেখতে আসে। প্রশংসা করতে করতে ‘নজর’ লেগে যায়। নজর লাগলে জামাই অসুস্থ হয়, সংসারে অমঙ্গল হয়। তাই শাশুড়ি পাখা নেড়ে হাওয়া দিতে দিতে “ষাট ষাট” বলে সেই নজর কাটান। ‘ষাট’ শব্দটা ‘শাপ’ বা ‘অশুভ’ কাটানোর ধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কেউ বলেন ‘ষাট’ = ‘ষষ্ঠী মায়ের নাম’।
গল্প ৩: সংখ্যার খেলা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি। ‘ষষ্ঠী’ থেকেই ‘ষাট’। আবার জামাইকে ৬ রকম ফল, ৬ রকম মিষ্টি দেওয়ার রীতিও আছে। ৬ সংখ্যাটা এখানে শুভ। ‘ষাট ষাট ষাট’ বলে যেন ৬০ বছর আয়ু কামনা করা হয়।
তালপাতার পাখার ৩টি গোপন শক্তি - লোকবিশ্বাস মতে: ১. শীতলতা: ইলেকট্রিক পাখার হাওয়া শুকনো। তালপাতার হাওয়া ভেজা-ঠান্ডা। জ্যৈষ্ঠের লু-তে জামাইয়ের মাথা ঠান্ডা রাখে। ২. পবিত্রতা: তালগাছকে শুভ গাছ মানা হয়। তালপাতার পাখায় অশুভ শক্তি ঢুকতে পারে না। ৩. শব্দ: পাখা নাড়ার মৃদু ‘সরসর’ শব্দ + “ষাট ষাট” ধ্বনি মিলে একটা মন্ত্রের মতো কাজ করে। মন ভালো হয়ে যায়।
এখনকার জামাইষষ্ঠী: এখন তো AC, টেবিল ফ্যান এসে গেছে। তালপাতার পাখা অনেক বাড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়। কিন্তু “ষাট ষাট ষাট” ধ্বনিটা এখনও আছে। কারণ এটা শুধু শব্দ নয়, এটা শাশুড়ির ভালোবাসা। “আমার জামাইকে যেন কারও নজর না লাগে” - এই প্রার্থনা।
শেষ কথা: জামাইষষ্ঠীর এই রীতির আড়ালে কোনো কুসংস্কার নেই। আছে এক মায়ের উদ্বেগ, আছে গ্রামবাংলার প্রকৃতি-নির্ভর জীবনবোধ। তালপাতা আর ‘ষাট ষাট’ মিলে জামাইকে দেয় ঠান্ডা হাওয়া + আশীর্বাদ।
তাই পরের বার শাশুড়ি যখন পাখা নাড়বেন, মুচকি হাসুন। বুঝবেন, ওই “ষাট ষাট” এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ৬০ বছরের ভালোবাসা।

