রোজকার রান্নাঘরে আটা মাখা শেষ হলেই মা-ঠাকুমারা ওপরে কয়েকটা আঙুলের ছাপ বসিয়ে দেন। ছোটবেলা থেকে দেখা এই অভ্যাসটা এমনি এমনি নয়। এর পিছনে লুকিয়ে আছে পিতৃপুরুষ, পিণ্ডদান এবং অন্নের পবিত্রতা নিয়ে এক প্রাচীন সনাতন বিশ্বাস।

বাঙালি রান্নাঘরে রোজকার একটা চেনা ছবি। মা আটা মাখছেন। সুন্দর করে গোল করে ডেলাটা পাত্রে রেখে ওপরে আলতো করে তিনটে-চারটে আঙুলের ছাপ বসিয়ে দিলেন। তারপর একটা ভেজা কাপড় চাপা দিলেন। ছোটবেলায় আমরা ভাবতাম, এটা বোধহয় আটা নরম হল কিনা পরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু না, এর পিছনে আছে বহু শতাব্দী পুরনো এক গভীর লোকাচার, যার শিকড় জড়িয়ে আছে হিন্দুধর্মের পিতৃপুরুষ ও অন্নতত্ত্বের সঙ্গে।

কারণগুলি জানুন

১. সবচেয়ে বড় কারণ - পিণ্ড থেকে মানুষের খাবারকে আলাদা করা: এটাই প্রধান কারণ হিসেবে মানা হয়। হিন্দুধর্মে শ্রাদ্ধ বা পিণ্ডদানের সময় চাল বা যবের আটার গোল, মসৃণ বল বানিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। তাকে পিণ্ড বলা হয়। রোজকার ব্যবহারের জন্য যে আটা মাখা হয়, সেটাও দেখতে অবিকল একই রকম - গোল, মসৃণ একটি তাল।

প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, যদি মাখা আটা ওভাবে গোল অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়, তাহলে তা পিতৃপুরুষের জন্য নিবেদিত পিণ্ডের সমতুল্য হয়ে যায়। তাই সেই গোল আকারটিকে ভেঙে দেওয়ার জন্য, তাকে মানুষের ব্যবহারের যোগ্য করে তোলার জন্য ওপরে আঙুলের ছাপ বসিয়ে দেওয়া হয়। এই ছাপটাই হল সংকেত - যে, এই খাবারটি জীবিত মানুষের জন্য, মৃত পূর্বপুরুষের জন্য নয়।

২. পিতৃদোষ ও অশুভ শক্তি এড়াতে: গ্রাম বাংলায় এখনও অনেক পরিবারে বিশ্বাস করা হয়, মাখা আটাকে গোল মসৃণ অবস্থায় অনেকক্ষণ রেখে দিলে ঘরে পিতৃদোষ লাগতে পারে বা অশুভ শক্তির নজর পড়ে। আঙুলের দাগ দিয়ে সেই নিখুঁত গোল আকৃতিটি নষ্ট করে দিলে আর কোনও দোষ থাকে না। এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক টোটকা হিসেবে কাজ করে।

৩. অন্নকে সম্মান ও দেবী অন্নপূর্ণার প্রতীক: সনাতন শাস্ত্রে বলা হয়, 'অন্নং ব্রহ্ম'। অন্নকে স্বয়ং দেবী অন্নপূর্ণা হিসেবে পূজা করা হয়। আটায় আঙুলের ছাপ দেওয়াকে অন্নের প্রতি সম্মান প্রদর্শন হিসেবেও দেখা হয়। অনেকে বলেন, মা-ঠাকুমারা নিজেদের হাতের ছাপ রেখে যান অন্নের ওপর, যাতে সেই অন্নে তাঁদের মমতা ও আশীর্বাদ লেগে থাকে। যেখানে অন্নকে সম্মান করা হয়, সেখানে কখনও অভাব হয় না।

৪. একটি ব্যবহারিক কারণও আছে: আগেকার দিনে আটা মেখে অনেকক্ষণ রেখে দেওয়া হত। আঙুলের ছাপ দিলে বোঝা যেত আটাটা কতটা ফুলেছে বা সেট হয়েছে কিনা। ছাপটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলে বোঝা যেত আটা রুটি বেলার জন্য একদম প্রস্তুত।

এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, কিন্তু এই ছোট্ট আঙুলের ছাপের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি, শ্রদ্ধা এবং খাবারের প্রতি গভীর ভালোবাসা। তাই পরেরবার মাকে এই ছাপ দিতে দেখলে বুঝবেন, এটি শুধু অভ্যাস নয়, একটি আশীর্বাদ।