Travel Tips: এটি সাধারণ কোনও মন্দির নয়, এটি একটি জীবন্ত যোগশাস্ত্র। হুগলির বাঁশবেড়িয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ১৩ চূড়ার হংসেশ্বরী মন্দির বাংলার আর পাঁচটা মন্দিরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে প্রতিটি ইটে লেখা আছে তন্ত্র ও ষটচক্র ভেদের গোপন সংকেত।

Travel Tips: কলকাতা থেকে একটু দূরে ব্যান্ডেলের পথে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে আছে এমন এক মন্দির, যা দেখলে প্রথমবার মনে হবে এ বাংলার মন্দিরই নয়। এখানে কোনও টেরাকোটার কারুকাজ নেই, নেই চেনা চূড়ার ধাঁচ। আছে ১৩টি পদ্মকুঁড়ির মতো চূড়া, পাঁচতলা উঁচু এক গোলকধাঁধা স্থাপত্য। এটি হুগলির বাঁশবেড়িয়ার হংসেশ্বরী মন্দির। বাইরে থেকে দেখলে রাশিয়ান দুর্গ মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানব শরীরের গোপন নকশা। এটি সাধারণ কোনও মন্দির নয়, এই মন্দিরের প্রতিটি খাঁজে জড়িয়ে রয়েছে প্রাচীন তন্ত্র ও ষটচক্র জাগরণের রহস্যও নেওয়া পদ্মে তাঁর অধিষ্ঠান। তিনি কালী, তবে এখানে তিনি কুলকুণ্ডলিনীর রূপে বিরাজমান। হুগলির বাঁশবেড়িয়ার মা হংসেশ্বরীর মন্দির শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি এক জীবন্ত যোগমার্গ। শ্রীরামকৃষ্ণদেবও এই রত্ন স্থাপত্যের সঙ্গে এর কোনও মিল নেই। দূর থেকে দেখলে মনে হবে রাশিয়ার ক্রেমলিন বা কোনও ইংরেজ দুর্গ।

৫ তলা উঁচু, ২৭.৫ মিটার উঁচু এই মন্দিরে আছে ১৩টি পদ্মকুঁড়ির মতো চূড়া বা রত্ন। ASI-এর মতে, এটি রত্ন শৈলীর হলেও এর অলংকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর ৫টি তলা আসলে মানবদেহের ৫টি নাড়ি - বজ্রাক্ষ, ইড়া, চিত্রিণী, পিঙ্গলা ও সুষুম্নার প্রতীক। মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে ১৩টি চূড়া পর্যন্ত গেছে সরু সুড়ঙ্গ পথ, যা আমাদের শরীরের স্নায়ুতন্ত্রের মতো। এটাই হল তান্ত্রিক 'ষটচক্রভেদ' তত্ত্ব।

ভেতরে দেবী চতুর্ভুজা, নীলবর্ণা, নিম কাঠের তৈরি। শ্বেত শিবের নাভি থেকে বের হওয়া পদ্মের উপর তিনি দণ্ডায়মান। তিনি কালী, কিন্তু এখানে তিনি কুলকুণ্ডলিনী শক্তি।

বিলেত যাওয়া বাতিল করে মন্দির কেন?

ইতিহাস বলছে, বাঁশবেড়িয়ার জমিদার রাজা নৃসিংহদেব রায় ১৭৯২ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত কাশীতে ছিলেন। সেখানে তিনি তন্ত্রে কুণ্ডলিনী ও ষটচক্র তত্ত্ব নিয়ে গভীর সাধনা করেন। কিংবদন্তি অনুযায়ী, দেবী কালী স্বপ্নে তাঁকে এই মন্দির বানাতে বলেন।

তিনি ঠিক করেছিলেন বিলেত যাবেন স্থাপত্য শিখতে। কিন্তু গুরুর নির্দেশ ও স্বপ্নাদেশে বিলেত যাওয়া বাতিল করে ১৭৯৯ সালে চুনার পাথর ও কারিগর এনে শুরু করেন এই যোগ-মন্দিরের কাজ। ১৮০২ সালে দুই তলা শেষ করেই তিনি মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী রানি শঙ্করী ৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ১৮১৪ সালে মন্দির সম্পূর্ণ করেন। মন্দিরের প্রবেশদ্বারে শকাব্দ ১৭৩৬ (১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ) লেখা সংস্কৃত ফলক আজও তার প্রমাণ।

গোপন সিঁড়ি ও গুরুর নির্দেশের রহস্য:

স্থানীয় বিশ্বাস, এই মন্দিরের ৫ তলা দিয়ে ওঠার গোলকধাঁধা সিঁড়ি সাধারণ ভক্তদের জন্য নয়। এটি তন্ত্র সাধনার মার্গ। গুরুর দীক্ষা ও নির্দেশ ছাড়া এই সংকীর্ণ, অন্ধকার পথে পা রাখলে দিকভ্রম ও বিপদের ভয় থাকে। কারণ প্রতি তলাই এক একটি চক্র ভেদের স্তর।

তাই আজও মূল গর্ভগৃহ ছাড়া ওপরের তলায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ।

উইকেন্ড প্ল্যান

কলকাতা থেকে মাত্র ৪৫ কিমি। ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমে টোটোয় বাঁশবেড়িয়া। পাশেই আছে ১৬৭৯ সালের পোড়ামাটির অনন্ত বাসুদেব মন্দির। শ্রীরামকৃষ্ণদেবও এই স্থানের আধ্যাত্মিক টানে একাধিকবার এসেছিলেন। একদিনের ভ্রমণে ইতিহাস, তন্ত্র আর স্থাপত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখতে চাইলে হংসেশ্বরী আপনার জন্যই।

আরও খবরের জন্য চোখ রাখুন এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে, ক্লিক করুন এখানে।