শমিকা মাইতিঃ ভোট বড় বালাই। সংসারের ঘানি-চাকায় পেষা মহিলাদের ভোটও মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছে ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে। বিজেপি যেখানে তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে পাতার পর পাতা খরচ করেছে মহিলাদের উন্নয়ন প্রকল্পে, সেখানে উত্তরপ্রদেশের মতো বিজেপি-শাসিত রাজ্যে হাথরসের মতো ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে করিয়ে নারী-সুরক্ষার প্রসঙ্গে পদ্মশিবিরকে বিঁধছে তৃণমূল।

পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটার ৪৯ শতাংশের বেশি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের মহিলা প্রার্থী ছিলেন ৪৫ জন, বিজেপির যেখানে ৩১। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের মহিলা প্রার্থী ছিলেন ১৭ জন, বিজেপির যেখানে ৫ জন। ২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ৫১ (১৮ শতাংশ), বিজেপির যেখানে ৪২ (চূড়ান্ত নয়, কারণ সমস্ত আসনে মনোনয়ন দাখিল হয়নি এখনও)। অর্থাৎ যুযুধান দুই পক্ষই তাদের মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়েছে।

নির্বাচনী ইস্তাহারেও দুই পক্ষ মহিলা ভোটারদের কথা মাথায় রেখেছে। তবে, প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলকে অনেক পিছনে ফেলে দিযেছে বিজেপি। মমতা সরকারের জনপ্রিয় কন্যাশ্রী (যা আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও) প্রকল্পের টেক্কা হিসাবে বিজেপির ইস্তাহারে ১৮ বছর বয়সের পরে মেয়েদের ২ লাখ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের নাম ‘বালিকা আলো’। বলা হয়েছে, ছাত্রীরা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠলেই বছরে তিন হাজার, নবম শ্রেণিতে পাঁচ হাজার এবং একাদশ শ্রেণিতে উঠলে সাত হাজার টাকা করে পাবে।

আরও পড়ুন - দলবদলুদের ভোট দেয় না বাংলা, শুভেন্দু-রাজীবদের জন্যই কি মার খাবে বিজেপির জয়ের স্বপ্ন

আরও পড়ুন - 'ভাইপো'র জন্যই কি ডুবছে তৃণমূল, নাকি আসন্ন নির্বাচনে তিনিই 'দিদি'র অক্সিজেন

আরও পড়ুন - বঙ্গ ভোটে পদ্ম হাতে ৯ মুসলমান, বিজেপি কি সত্যিই সংখ্যালঘু-বিরোধী - কী বলছেন প্রার্থীরা

সরকারি চাকরিতেও মেয়েদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ থাকবে। সর্বোপরি, মেয়েদের প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সমস্ত খরচ মকুব করে দেওয়া হবে। এমনকী সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থায় বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবে মেয়েরা। তফসিলি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি ও আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা পরিবারে কন্যা সন্তান জন্ম নিলেই ৫০ হাজার টাকার বন্ড দেওয়া হবে। এই শ্রেণির পরিবারে ১৮ বছর বয়সের পরে বিয়ে হলে মহিলাদের জন্য ১ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইস্তাহারে।

সাংগঠনিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে তৃণমূল ও বিজেপি মহিলা সংগঠনের সমানে সমানে টক্কর চলছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে দেখা যায়, মহিলা ভোটের বড় একটা অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। বাধ্য হয়েই ২০১৯ সালের মে মাসে নৈহাটির এক সভায় মহিলা তৃণমূল কর্মীদের নিয়ে বঙ্গজননী বাহিনী গড়ার কথা ঘোষণা করতে হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সংগঠনের মাথায় বসানো হয় দলীয় সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে। তবে সেই বাহিনী তৃণমূলকে সাংগঠনিকভাবে বাড়তে খুব একটা সহায়তা করেছে, তেমনটা নয়।


বরং নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে বিজেপির মহিলা মোর্চা। সর্বভারতীয় মহিলা মোর্চার সম্পাদিকা বিজয়া রাহাতকার জেলায় জেলায় সংগঠনের হয়ে মিটিং-মিছিলের আয়োজন করছেন। জেলা জেলায় প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজেপির মহিলা মোর্চার সভানেত্রী অগ্নিমিত্রা পল। বিজেপির সভাগুলিতে উপচে পড়ছে মহিলাদের ভিড়। বিহার নির্বাচনে বিজেপির জয়ের অন্যতন কারণ ধরা হয় এই মহিলা ভোটারদেরই। তাঁদের বলা হয় সাইলেন্ট ভোটার বা নিঃশব্দ ভোটার। উজ্জ্বলা যোজনা, হর ঘর জল -এর মতো নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিভিন্ন নারী কল্যানমূলক প্রকল্প রাজ্য নির্বিশেষে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে বিজেপির একটা আলাদা জায়গা তৈরি হয়েছে, এমনটাই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই অবস্থায় মহিলা মহলে বিজেপি-র জনপ্রিয়তার মোকাবিলা করতে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে মহিলাদের উপরে নির্যাতন, অত্যাচারের ঘটনা তুলে ধরছে তৃণমূল নেতা-নেত্রীরা। তবে, পার্ক স্ট্রিট কাণ্ড থেকে কামদুনি-র মতো একাধিক ঘটনা এবং সেগুলির প্রেক্ষিতে রাজ্য সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা মমতার অসংবেদনশীল মন্তব্য তাদের সেইসব আক্রমণ ভোঁতা করে দিয়েছে। সবথেকে বড় ধাক্কা এসেছে সোমবারই। নিমতায় বিজেপি কর্মীর ৮৫ বছরের মা-এর মৃত্যু হয়েছে। যাঁকে তৃণমূলের গুন্ডারা বেধড়ক মেরেছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল। ভোটের মুখে এই ঘটনা নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে আরও বড় আক্রমণের পথে যাচ্ছে বিজেপি। মা-বোনদের পা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার পর্যন্ত যেতে পারবেন তো হুইল চেয়ারে বসা মমতা?