শমিকা মাইতি: তখনও আমফান-ক্ষত শুকোয়নি। মাথার উপরে ছাদ হারিয়ে বহু পরিবার কার্যত খোলা আকাশের নীচে দিন কাটাচ্ছে। একরের পর একর জমিতে ধান-সব্জি নষ্ট হওয়ায় চাষিদের মাথায় হাত। কোভিড-পরিস্থিতির জেরে কর্মহীন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভেবে পাচ্ছে না আগামী দিনে ভাত-কাপড়ের সংস্থান হবে কী করে। এমন সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, দুর্গাপুজো করার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে পুজোকমিটিগুলিকে দেওয়া হবে। হরির লুটের বাতাসা ছড়ানোর মতো করে সরকারি কোষাগারের টাকা খরচ করা যেন মুখ্যমন্ত্রীর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কখনও পাড়ার ক্লাবকে টাকা দিচ্ছেন, কখনও কলেজকে, কখনও ইমাম ভাতা, কখনও পুরোহিত ভাতা। আর বলছেন, ‘আমি দিয়ে দিলাম’, ‘আমি করে দিলাম’। অথচ, সরকারি টাকা মানে জনগণের ট্যাক্সের টাকা। দান-খয়রাতির পিছনে সেই টাকা খরচ না করে রাজ্যের শিল্প বা কৃষির উন্নয়নে, নিদেনপক্ষে সরকারি চাকুরেদের বকেয়া ডিএ মিটিয়ে দিলে অনেক বেশি ভাল হত বলে মনে করছেন রাজ্যবাসী। 

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই রাজ্যের ক্লাবগুলিকে ঢালাও অর্থসাহায্য দেওয়া শুরু করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল বিধায়ক ও কাউন্সিলরদের বাছাই করা ক্লাবগুলিকে টাকা দিতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত খরচ হয় ২২৫ কোটি টাকা। প্রথম দফার ২ লক্ষ ও আরও তিন দফায় ১ লক্ষ করে মোট ৫ লক্ষ টাকা পেয়েছিল কলকাতা পুরএলাকার প্রায় ১০৫০টি ক্লাব।  সব মিলিয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্লাবে অনুদান বাবদ কোষাগারের ১,৩০০ কোটি টাকা খরচ করেছে তৃণমূলের সরকার। শুধু ক্লাব নয়, খয়রাতি লুট হয়েছে আরও অনেক জায়গায়। ২০১৬ সালে অগস্ট মাসে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের কলেজগুলিকে টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। না কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়নে নয়, এই ‘উপহার’  দেওয়া হয়েছিল কলেজ চত্বরে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নিখাদ মেলা উৎসব করার জন্য।  

"

মেলা-হইচই করার পাশাপাশি পুজো নিয়েও খুব চিন্তা মুখ্যমন্ত্রীর। তাই দুর্গাপুজো করার জন্য ২০১৮ সালে রাজ্যের ২৮ হাজার ক্লাবকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেয় তৃণমূল সরকার। ২০১৯ সালে সেটা বেড়ে হয় ২৫ হাজার। আর ২০২০তে ৫০ হাজার। গত দুর্গাপুজোয় রাজ্যের মোট ৩৭ হাজার পুজোকমিটিকে অনুদান দিতে ১৮০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।  শুধু তাই নয়, অ্যাক্রেডিশন কার্ড আছে এমন সাংবাদিকদের পুজোর সময় বোনাস দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। কলকাতায় ২০০০ টাকা আর রাজ্যের অন্যত্র ১০০০ টাকা।  বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে খেলাশ্রী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী ফের ক্লাবগুলোকে টাকা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। এবারের অজুহাত, খেলার উন্নতি। রাজ্যে ৮ হাজার ২৮৯টি ক্লাবকে মোট ৮২ কোটি ৮৯ লক্ষ টাকার অনুদান অর্থাৎ ক্লাবপিছু ১ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। এছাড়াও ৯৪৭টি স্পোর্টস কোচিং ক্যাম্পকে এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করা হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, বিধানসভা ভোটের আগে টাকা ছড়াতেই কল্পতরু হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মমতাকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘টাকা দিয়ে ভোট কেনা যায় না। যে যা দিচ্ছে নিয়ে নিন। ভোটটা আমাদের দিন।’  

আরও পড়ুন - বঙ্গের কোন কোন কেন্দ্রে সহজে জিতবে বিজেপি, কোথায় লড়াই কঠিন - কী বলছে দলের গোপন বিশ্লেষণ

আরও পড়ুন - বাদ 'জয় শ্রীরাম', ভরসা নিজের কাজ - শুভেন্দুর থেকেও কঠিন পরীক্ষায় এবার রাজীব, দেখুন

আরও পড়ুন - হাজার টাকার কুপন বিলি, BJP-র বিরুদ্ধে ভোট কেনার গুরুতর অভিযোগ করল TMC

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য বলছেন, রাজনীতির কথা ভেবে তিনি ক্লাবে টাকা দেননি। টাকার বিনিময়ে কোনও ক্লাবকে তৃণমূলের কাজ করতেও বলেননি। তাঁর দাবি, ক্লাবের ছেলেরা এলাকায় অনেক কাজ করে, প্রশাসনের পক্ষে যা করা সম্ভব হয় না। টাকার জন্য সেই সব কাজ যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য অনুদানের ব্যবস্থা।

মমতার সেই দাবি উড়িয়ে সিপিএমের অভিযোগ, এই রাজ্যে কোষাগারের টাকা নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করছে তৃণমূলের সরকার। গত জানুয়ারি মাসে ভবন ও নির্মাণকাজে যুক্ত শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার ফান্ড থেকে ১৪০০ কোটি টাকা সরিয়ে কোষাগারে ঢোকানো হয়েছে। এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে ওয়েলফেয়ার বোর্ডের মিটিংয়ে শ্রমিক ইউনিয়নগুলি সরব হলেও লাভ হয়নি। রাজ্যের চাষিদের অবস্থাও তথৈবচ। সদ্য এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, রাজ্য সরকার চাষিদের কাছ থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে যতটা ধান জোগাড় করার কথা তার মাত্র ২২ শতাংশ সংগ্রহ করতে পেরেছে এবার। চাষিদের বক্তব্য, সরকারের কাছে ধান বিক্রি করে লাভ নেই। তার চেয়ে খোলাবাজারে বেশি টাকা পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনা হল, কেন্দ্রীয় সরকার ধানের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য হিসাবে বেঁধে দিয়েছে ক্যুইন্টাল প্রতি ১৮১৫ টাকা। এই রাজ্যে তার চেয়ে মাত্র ২০ টাকা বেশি দিয়ে ধান কিনছে সরকার, যেখানে কেরালার মতো রাজ্যে ৮৬৫ টাকা প্রতি কুইন্টালে বেশি দাম দিয়ে ধান কিনছে রাজ্য সরকার।  দান-খয়রাতির পিছনে হরির লুট না করে ধানের সহায়ক মূল্য বাড়ালে কিংবা বন্ধ কলকারখানা খোলার বন্দোবস্ত করলে আখেরে অনেক বেশি উপকৃত হতেন রাজ্যের মানুষ।