নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর বর্ষাকালে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তিনি বলেন, জুলাই-অগাস্ট মাসে পাহাড়ে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। পাশাপাশি, নেপালকে ভারতের ১০ টন ত্রাণ পাঠানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বিশ্বজুড়ে ভারতের মানবিক ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।
'বর্ষায় পাহাড়ে যাবেন না': দিলীপ ঘোষ
নেপালের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বৃহস্পতিবার মুখ খুলেছেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মানুষ "ঝুঁকি পুরোপুরি না বুঝে" পাহাড়ে বেড়াতে যায়। তাঁর মতে, জুলাই এবং অগাস্টের মতো ভরা বর্ষার মাসগুলিতে পর্যটকদের পাহাড়ি এলাকায় যাওয়া একদম এড়িয়ে চলা উচিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দিলীপ ঘোষ বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, প্রায়শই মানুষ ভারী বৃষ্টির সময় ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপদ ডেকে আনে।
দিলীপ ঘোষ বলেন, "এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি। প্রাকৃতিক ঘটনা কারও নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, আমরা বারবার দেখি মানুষ ঝুঁকি না বুঝেই পাহাড়ে চলে যায়... আমরা দেখেছি, মানুষকে উদ্ধার করার জন্য হেলিকপ্টার পাঠাতে হয়েছে, আবার অনেকে নিখোঁজও হয়ে গিয়েছেন; অতীতের এই ধরনের ঘটনাগুলি সত্যিই মর্মান্তিক এবং এর ফলে বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। তাই জুলাই এবং অগাস্ট মাসে পাহাড়ে যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। তাছাড়া, এই ধরনের ঘটনার সঠিক প্রকৃতি যেহেতু আগে থেকে বোঝা যায় না, তাই সরকার সেখানে যাওয়া মানুষদের উদ্ধারের জন্য সবরকম চেষ্টা করছে, তারা জীবিত হোক বা মৃত..."
'ফার্স্ট রেসপন্ডার' হিসেবে ভারতের ভূমিকা
বিশ্বজুড়ে মানবিক সংকটের সময় ভারতের ভূমিকার কথা তুলে ধরে এই বিজেপি নেতা আরও বলেন, "দেখুন, বিশ্বের যেখানেই বিপর্যয় ঘটুক না কেন, ভারতই প্রথম সাহায্যের জন্য এগিয়ে যায়। আমরা ডাক্তার, ওষুধ, এনডিআরএফ টিম এবং স্নিফার ডগ স্কোয়াড পাঠাই। গ্রিস হোক, বিভিন্ন দেশের ভূমিকম্প হোক, বা এমনকি পাকিস্তান, আমরা সাহায্য করি। আমরা আফ্রিকা এবং আমেরিকাতেও সাহায্য পাঠাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বন্যার সময়, সেখানে বসবাসকারী ভারতীয়রাই প্রথম সেবার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। আমরা নিঃস্বার্থ সেবাকেই পরম ধর্ম বলে মনে করি এবং সরকার এই নীতিতেই কাজ করে। এই মর্মান্তমান্তিক ঘটনায় সকলেই গভীরভাবে মর্মাহত।"
নেপালের হড়পা বানে মৃত ১৫০-র বেশি
দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার নেপালের ভোটেকোশী নদীতে বিধ্বংসী হড়পা বানে কমপক্ষে ১৫৭ জন নিহত এবং প্রায় ৪০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিক এবং নিরাপত্তা কর্মীরাও রয়েছেন। দুপুরের এই হড়পা বান তিনটি জেলা জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নেপালের অন্যতম মারাত্মক বিপর্যয় হিসেবে ঘরবাড়ি, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
সিএনএন নেপালের পুলিশের এক্স (X) হ্যান্ডেলের পোস্ট উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই বিধ্বংসী হড়পা বানে অন্তত ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুরুতে মনে করা হয়েছিল, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পই তুষারধসের নেপথ্যে। ভূমিকম্পের তথ্য আসায় ভাবা হয়েছিল, মাটি কাঁপতেই ভেঙে পড়ে হিমবাহের টুকরো! কিন্তু পরে মার্কিন ভূতত্ত্ব সর্বেক্ষণ জানিয়ে দেয়, আমাদের চিরচেনা ‘ভূমিকম্প’ হয়নি। ৫.২ মাত্রার যে কম্পন রেকর্ড হয়েছে, তার কারণ ওই তুষারধসই। নেপথ্যে তুষারধসের ‘ওজন’!
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার জানিয়েছেন, ছোটখাট নয়, বিরাট মাপের হিমবাহ-টুকরো ভেঙে পড়ে বুধবার। হিমবাহ-টুকরোর মাপ চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। শুগারের দেওয়া হিসেব, ২০০০ ফুট চওড়া হিমবাহ-টুকরো সটান ৪০০০ ফুট নীচে আছড়ে পড়ে। গোটা ঘটনাটা ঘটেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭০০০ ফুট উঁচুতে। অর্থাৎ, মূল হিমবাহ রয়েছে ১৭০০০ ফুটে, তার থেকে বিশালাকার টুকরো ভেঙে পড়েছে ১৩ হাজার ফুটে! এ যেন উপত্যকায় ‘বম্বিং’!
শুগারের ব্যাখ্যা, ওই বিশাল চেহারার টুকরো তিব্বতের লেন্ডে নদীতে ভেঙে পড়তেই জল, বরফ, কাদা, পাথর, বোল্ডার মিশে মুহূর্তের মধ্যে ‘জলবোমা’র আকার নেয়। যেহেতু পাহাড়ি নদীর ঢাল বেশি, চোখের পলকে, দু’কুল ভাসিয়ে, বলা ভালো দু’কুল ধ্বংস করতে করতে নামে ‘জলবোমা’। পাহাড় এতটাই খাড়াই, নদীর জলস্তরের উচ্চতা বাড়তে বিশেষ সময় লাগেনি।
পাশে দাঁড়াল ভারত
এদিকে, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর বন্ধু দেশ নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস এই সংকটকালে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, যা হিমালয়ের এই দেশটির সঙ্গে ভারতের গভীর অংশীদারিত্বের পরিচয় দেয়। নেপালে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস এক্স-এ পোস্ট করে জানিয়েছে, "সবসময় নেপালের সঙ্গে। রাষ্ট্রদূত নবীন শ্রীবাস্তব ভারতের পক্ষ থেকে ১০ টন মানবিক ত্রাণ সামগ্রী নেপালের সংস্কৃতি, পর্যটন ও অসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী খড়্গ রাজ পৌডেলের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই সহায়তা বিধ্বংসী বন্যার পর ত্রাণকার্যে সাহায্য করবে। ভারত দৃঢ়ভাবে নেপালের পাশে আছে এবং সম্ভাব্য সবরকম সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"


