Jadavpur University: টানা অশান্তির পর যাদবপুরে শান্তি ফেরানোর আবেদন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের। পড়ুয়াদের দাবি, তদন্তে ছাত্র প্রতিনিধিদের রাখা হোক।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উত্তপ্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। ক্যাম্পাসে পরপর উত্তেজনা, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং রাজনৈতিক তরজার আবহে তাঁর বার্তা— কোনও প্ররোচনা বা পাল্টা প্ররোচনার জেরে পরিস্থিতি আরও খারাপ করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সব পক্ষকেই শান্ত থাকার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত উপাচার্যদের কর্মশালায় যোগ দেন জগন্নাথ। সেখানেই যাদবপুর প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে যে ধরনের ঘটনা ঘটছে তার নিন্দা করা হচ্ছে। ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক-সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকের কাছে শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা, গবেষণা ও উৎকর্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে যাদবপুরের যে পরিচিতি রয়েছে, কোনও অশান্তির কারণে তা ক্ষুণ্ণ হওয়া উচিত নয়।
গত ১৯ অগস্ট রাত থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনার সূত্রপাত। গভীর রাতে ক্যাম্পাসে হামলার অভিযোগ ওঠে এবিভিপির বিরুদ্ধে। এরপর থেকেই বাম ও দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে। বিজেপি নেতৃত্বও একাধিক বার যাদবপুরের বামপন্থী পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলেছে। তবে উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে মূলত ক্যাম্পাসে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরানোর বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে।
এর আগে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তও যাদবপুরে শিক্ষার পরিবেশ ও উৎকর্ষ বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কথিত ভারত-বিরোধী দেওয়াল লিখন ও প্রচার নিয়েও সরব হন। তিনি স্পষ্ট করে দেন, কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভারত-বিরোধী প্রচারের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। উচ্চশিক্ষামন্ত্রী অবশ্য তাঁর বক্তব্যে সেই বিতর্কে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ স্বাভাবিক করার উপর জোর দেন।
এ দিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা হলেও তা শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি। দক্ষিণপন্থী ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মীদের একাংশ বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান। পরে বামপন্থী পড়ুয়াদের সঙ্গেও আলোচনা হয়। সেই সময় উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যকে ঘেরাও পরিস্থিতি থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, সেই সময় অরবিন্দ ভবনের বারান্দায় পড়ে গিয়ে হাঁটুতে চোট পান উপাচার্য।
মঙ্গলবারও নিজেদের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানিয়েছেন পড়ুয়ারা। আগামী ২৭ অগস্ট যাদবপুরের ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা। পড়ুয়াদের দাবি, কমিটিতে ছাত্র প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তা না হলে অন্তত পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁদের রাখার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য যাতে কোনও ভাবেই পরিবর্তন বা নষ্ট না হয়, সে বিষয়েও নিশ্চয়তা চেয়েছেন তাঁরা।
পড়ুয়াদের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, ঘটনার সঙ্গে যাঁদের নাম বা উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত চলাকালীন তাঁদের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা। বিশেষ করে প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য তথা গণিতের অধ্যাপক বুদ্ধদেব সাউকে স্টুডেন্টস গ্রিভান্স রিড্রেসাল সেলের চেয়ারম্যান-সহ প্রশাসনিক পদ থেকে সরানোর দাবি ওঠে। পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে ক্লাস না নেওয়ারও দাবি জানান বামপন্থী পড়ুয়ারা। কর্তৃপক্ষ অবশ্য এই দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়নি। বরং ওই গ্রিভান্স রিড্রেসাল সেলই ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
অন্য দিকে বুদ্ধদেব সাউয়ের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, প্রবেশিকা পরীক্ষায় অনিয়ম ধরার কারণেই তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল।
যাদবপুরের পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসি ক্যামেরার কিছু ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেয়। মঙ্গলবার আরও ফুটেজ চাওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে পড়ুয়ারাও দাবি করেছেন, ঘটনার রাতে ক্যাম্পাসে যাঁদের উপস্থিতি সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, তদন্ত চলাকালীন তাঁদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হোক।
এই পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর শান্তির বার্তা কতটা কাজে আসে, এখন সেটাই দেখার। তদন্ত কমিটির বৈঠক এবং পড়ুয়াদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের পরবর্তী আলোচনা ঘিরেই আপাতত নজর রয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

