পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬ নিয়ে সংসদে জোর বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা চাইছে, বিলটি ভালো করে খতিয়ে দেখা হোক যাতে কোনও নিরপরাধ ফেঁসে না যায়। অন্যদিকে, প্রশ্নফাঁস রুখতে এই আইনকে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি।

সোমবার সংসদে পেশ হতে চলা পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬ নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরে একেবারে ভিন্ন সুর। বিরোধী সাংসদরা বিলের প্রতিটি ধারা খুঁটিয়ে দেখার দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে, প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় দুর্নীতি রুখতে এই বিলকে 'শক্তিশালী পদক্ষেপ' বলে স্বাগত জানিয়েছে বিজেপি।

বিরোধীদের দাবি: বিলটি ভালো করে খতিয়ে দেখা হোক

জেএমএম সাংসদ মহুয়া মাঝি বলেছেন, বিলটি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। তাঁর আশঙ্কা, এই আইনের জেরে নতুন করে কোনও অনিয়ম হতে পারে বা কোনও নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি পেতে পারেন। মহুয়া বলেন, "অবশ্যই বিতর্ক হওয়া উচিত, আমরা তো সব বিল নিয়েই আলোচনা করতে চাই। কিন্তু আমরা দেখেছি, শাসক দল প্রায়ই আলোচনা এড়িয়ে যায়, অথবা আলোচনা হলেও নিজেদের ইচ্ছেমতো বিল পাশ করিয়ে নেয়। তাই এই বিলে কী কী রাখা হয়েছে, আর তার ফলে ভবিষ্যতে কোনও সমস্যা হবে কিনা, তা আমাদের খুঁটিয়ে দেখতে হবে।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা এটা ভালো করে খতিয়ে দেখতে চাই, কারণ আগেও আমাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে প্রশ্নফাঁস হবে না। এটা তো প্রথমবার নয়, বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছে, তাতে আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে ভবিষ্যতে তাদের আর এই ধরনের হেনস্থার শিকার হতে হবে না।"

মহুয়া প্রশ্ন তোলেন, সরকার কেন আন্দোলনরত পড়ুয়াদের সঙ্গে আগে কথা বলেনি। তাঁর অভিযোগ, "সংসদ অধিবেশন শুরুর আগে ছাত্রছাত্রীরা ২২ দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল। সরকার তখন কেন তাদের সঙ্গে কথা বলেনি? ...যখন অধিবেশন শুরু হলো, তখন কোনও উপায় না দেখে পড়ুয়ারা সংসদ অভিযানের ডাক দেয়। আর সেখানে যেতেই তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়, কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়।"

তাঁর মতে, এই আইন তৈরির সময় সরকারের উচিত বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনও নিরপরাধকে হেনস্থা না হতে হয়। মহুয়া বলেন, "এখন যখন সরকার একটা বিল আনতে রাজি হয়েছে, তখন তাতে যেন কোনও ফাঁকফোকর না থাকে। বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলে এমন একটা বিল তৈরি করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কোনও নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি না পায়।"

কংগ্রেস সাংসদ ফুলো দেবী নেতাম এই বিলকে 'সময়োচিত পদক্ষেপ' বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, পড়ুয়াদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বারবার প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি তোলা হয়েছে। নেতাম বলেন, "এই পদক্ষেপ একদম ঠিক সময়ে নেওয়া হয়েছে। বিজেপি সরকার অবশেষে এই বিষয়টিতে নজর দিয়েছে, বিশেষ করে বারবার প্রশ্নফাঁসের যে সমস্যাটা হচ্ছে, তা নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে।"

তিনি আরও বলেন, "আসল প্রশ্ন হলো, এই সংকটটা তৈরি করল কে? এটা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন ছিল, যেখানে বারবার প্রশ্নফাঁস হয়েছে। এই নিয়ে বিজেপি সরকারের পাল্টা দোষারোপ করাটা ঠিক নয়। ছাত্রছাত্রীরা অবশ্যই জিতেছে, কারণ তাদের ন্যায়ের দাবি পূরণ হয়েছে।"

বিজেপির দাবি: দুর্নীতি রুখতে কড়া দাওয়াই এই বিল

অন্যদিকে, বিজেপি সাংসদ অশোক কুমার মিত্তল এই বিলকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই বিলের মাধ্যমে সংগঠিত চক্র যারা জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। মিত্তল বলেন, "আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই, কারণ তিনি নিজে এগিয়ে এসে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। নকল, জালিয়াতি ও প্রশ্নফাঁস রুখতে এবং পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা সংগঠিত চক্রগুলোকে কড়া শাস্তি দিতে নতুন বিল আনা হচ্ছে।"

তিনি জানান, প্রস্তাবিত আইনে ১০ বছরের জেল এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যাতে পরীক্ষায় দুর্নীতি রুখতে একটা শক্তিশালী বার্তা দেওয়া যায়। মিত্তল বলেন, "১০ বছরের জেল এবং ১০ কোটি টাকা জরিমানার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে এমন ভয় তৈরি হয় যে কোনও মাফিয়া এই ধরনের কাজ করার সাহসই না পায়। এটাই প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা। আমি নিশ্চিত, বিলটি সংসদে পাশ হবে এবং দ্রুত কার্যকর করা হবে।"

মিত্তল আরও জানান, সাম্প্রতিক পরীক্ষা সংক্রান্ত সমস্যা খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন। তিনি বলেন, "পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী সাম্প্রতিক ঘটনা তদন্তের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন, যার মাথায় রয়েছেন ইসরোর এক প্রাক্তন প্রধান এবং কমিটিতে আরও অনেক উচ্চপদস্থ আধিকারিক রয়েছেন। এতেই বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী চান যে পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত হোক, কোনও ফাঁক না থাকে, দোষীরা দ্রুত ধরা পড়ুক এবং ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টের মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের শাস্তি হোক।"

বিজেপির আরেক সাংসদ শশাঙ্ক মণি ত্রিপাঠী এই আইনকে একটি "অর্থবহ প্রস্তাব" বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, সরকার ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। ত্রিপাঠী বলেন, "এটি একটি অর্থবহ প্রস্তাব। আমরা জানি, এই বিলের মাধ্যমে কীভাবে আমাদের সন্তান ও ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা যায়, তা নিয়ে সারা দেশে কৌতূহল রয়েছে। একই সঙ্গে, আমি মনে করি, গোটা দেশ দেখেছে যে আমরা সত্যিই আমাদের পড়ুয়াদের রক্ষা করি।"

তিনি এই বিল নিয়ে বিরোধীদের প্রতিক্রিয়ার সমালোচনাও করেন এবং পরীক্ষা সংস্কারে সরকারের ভূমিকার পক্ষে সওয়াল করেন। তিনি বলেন, "বিরোধীরা যে চোখের জল ফেলছে, আমি তার নিন্দা করি। যদি তাদের ট্র্যাক রেকর্ড খতিয়ে দেখা হয়—যা আজ সংসদে প্রকাশ করা হবে—তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে এনটিএ তৈরির পর থেকে আমরা যে ধরনের কাজ করেছি, তা কেউ করেনি।"

ত্রিপাঠী বিরোধীদের বিরুদ্ধে এই বিষয়টিকে নিয়ে রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে বলেন, "এই বিষয়টিকে 'আমার বনাম তোমার'—এইভাবে দেখা উচিত নয়। বিরোধীদের এটাই সমস্যা। বিরোধীরা এখন দেখছে যে সংসদে তাদের কথা কেউ শুনছে না এবং অনেক সাংসদ তাদের শিবির ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। এতেই তারা অস্থির হয়ে এই ধরনের বিভেদমূলক কথা বলছে।"

বিলের প্রেক্ষাপট

পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) অ্যাক্ট, ২০২৪-কে সংশোধন করার জন্যই এই নতুন বিলটি আনা হচ্ছে। বিশেষ করে নিট-ইউজি ২০২৬ বিতর্কের পর প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। লোকসভায় বিলটি পেশ করবেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী (কর্মী, জনঅভিযোগ ও পেনশন) জিতেন্দ্র সিং।

বিলটি পেশ করার পর, মন্ত্রী এটিকে বিবেচনার জন্য এবং পাশ করানোর জন্য হাউসের কাছে প্রস্তাব রাখবেন।

সংসদের বাদল অধিবেশনের দ্বিতীয় সপ্তাহে এই বিলটি আনা হচ্ছে, যখন পরীক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। ৩৭ দিন ধরে যন্তর মন্তরে চলা সিজেপি ছাত্র আন্দোলন প্রত্যাহারের পরেই এই পদক্ষেপ। সরকার তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার পর আন্দোলন তুলে নেওয়া হয়। এছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে পরীক্ষা সংস্কারের জন্য একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স গঠনের ঘোষণা করেছেন এবং দেশজুড়ে ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন।