নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানে ত্রিশূলীর একটি স্কুল ভেসে যাওয়ার ঠিক আগে, এক শিক্ষক নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ১৬০০-র বেশি পড়ুয়াকে বাঁচিয়েছেন। পড়ুয়ারা প্রাণে বাঁচলেও, স্কুলবাড়িটি সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে যায়। এই বিধ্বংসী বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৭৯৪ ।

নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানে একের পর এক স্কুল ভেসে যাচ্ছে, চারিদিকে ধ্বংসলীলা। এর মধ্যেই চলছে উদ্ধারকাজ। ত্রিশূলীর একটি স্কুলে হড়পা বানের জল হু হু করে ঢুকতে থাকায় ১৬০০-র বেশি পড়ুয়ার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু একজন শিক্ষক মাথা ঠান্ডা রেখে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমস্ত বাচ্চাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেন। সময়ের বিরুদ্ধে এ এক অবিশ্বাস্য দৌড় ছিল। তাঁর এই সাহসিকতার জন্য সব পড়ুয়া প্রাণে বেঁচে গেলেও, স্কুলবাড়িটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ভয়াল স্রোতে ভেসে যায়।

কী হয়েছিল ভয়ঙ্কর প্রলয়ের দিনে?

বুধবার সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। সকাল ৯টা ২০ মিনিট নাগাদ প্রথম সতর্কবার্তা পান রাজেন্দ্র। এক বন্ধু ফোন করে জানান, ভয়াবহ স্রোতে গোটা গ্রাম ভেসে গিয়েছে। নদীর জল দ্রুত স্কুলের দিকে এগিয়ে আসছে। পরিস্থিতি বুঝে রাজেন্দ্রকে পড়ুয়াদের নিয়ে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় সরে যেতে বলেন তাঁর বন্ধু। ত্রিশূলী উপত্যকার ওই স্কুলটি নদীর জলস্তর থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে। তাই প্রথমে স্কুলভবন নিয়ে খুব একটা আশঙ্কা করেননি রাজেন্দ্র। কিন্তু তখন স্কুলে উপস্থিত ছিলেন ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া। যাদের দায়িত্ব ছিল প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্রের ঘাড়ে। মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের নিরাপত্তার দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। এর মধ্যেই এক অভিভাবক ছুটে এসে জানান, নদীর জল অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়ছে। আর সময় নষ্ট করেননি রাজেন্দ্র।

ছাত্রীদের বাঁচাতে বড় উদ্যোগ প্রধানশিক্ষকের

স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে অন্য শিক্ষকদের সতর্ক করেন। ক্লাসরুম খালি করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ডেকে পড়ুয়াদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্কুল থেকে কিছুটা উঁচুতে একটি গাছের নিচে পড়ুয়াদের নিয়ে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই দেখেন ভয়ঙ্কর স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছে তাদের স্কুল।

বাঁচাতে পারেননি যাদের!

তবে এক বাসচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। দূর থেকে রাজেন্দ্র দেখতে পান, বাসটি একটি সেতু পার হচ্ছে এবং ভয়াবহ স্রোত যে দিক থেকে আসছে, অজান্তেই সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। পরে সেই বাসটির আর কোনও খোঁজ মেলেনি। তবে পড়ুয়াদের সরিয়ে নেওয়ার পরেও দু’জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এক শিক্ষক স্কুলের পাশে নিজের বাড়িতে জলখাবার তৈরি করতে গিয়েছিলেন। বানের স্রোতে তিনি ভেসে যান। স্কুলের এক সাফাইকর্মীও দরজা বন্ধ করতে গিয়ে প্রবল জলের তোড়ে নিখোঁজ হন।

ছাত্রীর প্যানিক অ্যাটাক

এর মধ্যেই পড়ুয়াদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ছাত্রীর প্যানিক অ্যাটাক হলে রাজেন্দ্র তাঁকে মোটরসাইকেলে করে নিরাপদ জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এরপর বাকি পড়ুয়াদের নিয়ে আরও উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত একটি বড় গাছের নীচে আশ্রয় নেন সকলে।

তার কয়েক মুহূর্ত পরেই চোখের সামনে ঘটে ভয়াবহ দৃশ্য। প্রবল জল ও কাদার স্রোত গর্জন করতে করতে এসে আছড়ে পড়ে স্কুলভবনের উপর। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কংক্রিটের সেই স্কুলবাড়িও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে এখনও নিজের সিদ্ধান্তগুলি নিয়ে ভাবছেন রাজেন্দ্র। ১,৬৪৩ জন পড়ুয়ার প্রাণ বাঁচানোর পরেও তাঁর প্রশ্ন, আরও কিছু কি করা যেত? কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে উত্তরটা স্পষ্ট। কয়েক মিনিটের মধ্যে নেওয়া তাঁর সাহসী সিদ্ধান্তই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে অসংখ্য প্রাণ বাঁচিয়েছে। তাই এখন তাঁকেই ‘ত্রিশূলীর হিরো’ বলে ডাকছেন এলাকার মানুষ।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান

সংবাদসংস্থা এএনআই-এর সঙ্গে কথা বলার সময়, সুরেন্দর কুমার নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা সেই ভয়ঙ্কর মুহূর্তের কথা জানান। তিনি বলেন, কীভাবে বাচ্চাদের বাঁচানো হয়েছিল এবং যে স্কুলটি একসময় পড়ুয়াদের প্রাণ ছিল, তা এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ আর কাদায় ঢেকে আছে। সুরেন্দর কুমার বলেন, "এখানে একটা তিনতলা স্কুলবাড়ি ছিল। ঠিক তার সামনেই একটা রাম মন্দির। আর পুরো এলাকাটা ছিল বাজার। ওই ফাঁকা জায়গাটায় তিনতলা স্কুলটা ছিল। ১৬০০ পড়ুয়া সেখানে পড়ত। যেদিন এই ঘটনা ঘটল, শিক্ষকরা সব বাচ্চাকে বের করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান। এখন স্কুলের আর কোনও চিহ্নই নেই, পুরোপুরি ভেসে গেছে। একটা রাম মন্দিরও ছিল... এখানে অনেক লোক মারা গেছে... ঠিক কতজন, তার কোনও তথ্য এখনও নেই, তবে সংখ্যাটা অনেক। এখানকার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।"