Nepals Next Prime Minister: নেপালের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন প্রাক্তন র‍্যাপার, ইঞ্জিনিয়ার এবং কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বালেন শাহ। তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP)  সর্বসম্মতিক্রমে সংসদীয় দলনেতা নির্বাচিত করেছে। শুক্রবারই প্রেসিডেন্ট ভবনে শপথ নেবেন তিনি। 

নেপালের রাজনীতিতে ফের বড় চমক। দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন জনপ্রিয় নেতা বালেন শাহ। তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP) তাঁকে সংসদীয় দলনেতা হিসেবে বেছে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে আর কোনও বাধা রইল না।

RSP-র ছাড়পত্র বালেন শাহকে

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাঠমান্ডুতে পার্টির অফিসে সেন্ট্রাল কমিটির একটি বৈঠক হয়। সেখানেই কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র, পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রাক্তন র‍্যাপার বালেন শাহকে সংসদীয় দলনেতা করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়।

আগামিকাল, অর্থাৎ শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ভবনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেলের কাছে শপথ নেবেন বালেন। RSP-র নিয়ম অনুযায়ী, শুধুমাত্র সংসদীয় দলনেতাই প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর RSP-র সভাপতি রবি লামিছানে এবং বালেন শাহের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তি মেনেই দলের ১৮২ জন সাংসদের ভোটে বালেনকে এই পদের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। চুক্তির ৪ নম্বর পয়েন্ট অনুযায়ী, প্রাক্তন টিভি সঞ্চালক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রবি লামিছানে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকবেন। অন্যদিকে, বালেন শাহ হবেন সংসদীয় দলনেতা এবং হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান

স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে নতুন প্রধানমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হবে। সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী সময়টা দাঁড়ায় ১২৩৪। শপথের সময় সাতটি শাঁখ বাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলের নেতাদের বিশ্বাস, এই বিশেষ মুহূর্তে কোনও কাজ শুরু করলে তা সফল হবেই।

শপথ নেওয়ার সময় আরও কিছু আচার-অনুষ্ঠান চলবে। ১০৮ জন ‘বটুক’ (নবীন পুরোহিত) ‘স্বস্তি শান্তি’ পাঠ করবেন এবং ১৬ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু ‘অষ্টমঙ্গল’ পাঠ করবেন। হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই ধর্মেই এই রীতিগুলিকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।

শপথ নেওয়ার পর বালেন তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। দুপুর ২টো ১৫ মিনিট নাগাদ নতুন প্রধানমন্ত্রী সিংহ দরবারে তাঁর অফিসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

বালেন শাহের উত্থান

এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে বালেন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের (HoR) সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। ২০২২ সালে চোখে কালো চশমা পরা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার আর একসময়ের আন্ডারগ্রাউন্ড র‍্যাপার বালেন শাহ এমন এক কাণ্ড করেছিলেন, যা কেউ ভাবতেও পারেনি। নেপালের তাবড় রাজনৈতিক দলগুলোকে হারিয়ে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন।

লাঠি চিহ্ন নিয়ে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়ে বালেন ৬১,৭৬৭ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নেপালি কংগ্রেসের সিরজানা সিং পান ৩৮,৩৪১ ভোট এবং CPN-UML প্রার্থী তথা রাজধানীর প্রাক্তন মেয়র কেশব স্থাপিত পান ৩৮,১১৭ ভোট।

আর এখন, মাত্র চার বছর পর, ৩৫ বছর বয়সী বালেন শুধু আর স্থানীয় নেতা নন, তিনি দেশের ইতিহাসে অন্যতম তরুণ প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন।

বালেনের এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। ২০১৩ সালে র‍্যাপ ব্যাটেল লিগ ‘র বার্জ’ (Raw Barz)-এর মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা পেলেও, মেয়র পদে লড়ার জন্য প্রায় আড়াই বছর ধরে নীরবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।

হিমালয়ান হোয়াইট হাউস কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভারত থেকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রির মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।

তাঁর রাজনৈতিক কৌশলও ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ। সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে ৭৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু এবং কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগের পর, জেন-জি অ্যাক্টিভিস্টরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বালেনকেই প্রথম পছন্দ করেছিল।

কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে সমর্থন করেন। এটি ছিল তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয়। ছয় মাসের অস্থায়ী পদের বদলে তিনি পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ বেছে নেন।

২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি বালেন আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিতে (RSP) যোগ দেন এবং পরের দিনই জনকপুর থেকে তাঁর প্রচার শুরু করেন।

ওলি পরাজিত করে প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ

অনেকেই যে পদক্ষেপকে "বোকামি" বলেছিলেন, বালেন ঠিক সেটাই করেন। তিনি ঝাপা-০৫ কেন্দ্র থেকে নির্বাচনে লড়েন, যা ছিল বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ কেপি শর্মা ওলির দীর্ঘদিনের ঘাঁটি। আর সেখানেই বিপুল ভোটে ওলিকে পরাজিত করেন তিনি।

রাজধানী থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঝাপা-৫ কেন্দ্রটি নেপালের রাজনৈতিক পালাবদলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশাল উপস্থিতি এবং তাঁর বিস্ফোরক মেজাজ—এই দুই দিয়েই সাধারণ মানুষের সঙ্গে বালেনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ফেসবুকে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা ৩৫ লক্ষেরও বেশি। তাই চিরাচরিত সাংবাদিক বৈঠক এড়িয়ে তিনি সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলেন।

তবে, তাঁর এই "আনফিল্টারড" ব্যক্তিত্ব অনেক বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। নভেম্বরে একটি পোস্টে (যা পরে মুছে ফেলা হয়) তিনি আমেরিকা, ভারত, চিনের মতো ভূ-রাজনৈতিক শক্তি এবং RSP-সহ নেপালের সমস্ত বড় রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করেছিলেন। অথচ এর ঠিক দুই মাস পরেই তিনি RSP-তে যোগ দেন।

তাঁর আক্রমণাত্মক কথাবার্তা, এমনকি প্রশাসনিক কেন্দ্র সিংহদরবার "পুড়িয়ে দেওয়ার" হুমকির পরেও, তাঁর সমর্থকরা তাঁকে স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে একমাত্র "আসল" বিকল্প হিসেবে দেখেন।

১৯৯০ সালে জন্ম নেওয়া বালেন চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। তাঁর প্রয়াত বাবা রাম নারায়ণ শাহ একজন আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ছিলেন। বালেনের মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশের ঠিক আগেই তিনি মারা যান।

প্রধানমন্ত্রীর পদের দিকে নজর থাকলেও, বালেন এখনও কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐতিহ্যবাহী পরিকাঠামোর উপর পিএইচডি করছেন। এভাবেই তিনি একজন শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং জনপ্রিয় নেতার ভূমিকা একসঙ্গে পালন করছেন।

বালেন শাহ কি একজন দূরদর্শী সংস্কারক নাকি একজন অস্থির প্রকৃতির নেতা, তা সময়ই বলবে। তবে একটা কথা নিশ্চিত—নেপালে "পুরনোদের যুগ" শেষ হয়ে গিয়েছে।