সুইজারল্যান্ডে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে গোপন পরমাণু আলোচনা চলছে। ৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে পরমাণু কেন্দ্রে পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি, হরমুজ প্রণালীর সংকট এবং লেবানন পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কি শান্তি ফিরবে, নাকি নতুন সংঘাত শুরু হবে?

US Iran Nuclear Talks: মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক মাস ধরে চলা মারাত্মক উত্তেজনার মধ্যেই সুইজারল্যান্ডের সুন্দর 'বারগেনস্টক স্কি রিসোর্ট' এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সাক্ষী হতে চলেছে। এখানে মুখোমুখি বসেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল। এই হাই-ভোল্টেজ বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য হলো—ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং লেবাননে চলা ধ্বংসলীলা থামানো। ৬০ দিনের এই যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে সফল করতে পর্দার আড়ালে চলছে কোটি কোটি ডলারের খেলা এবং পরমাণু কেন্দ্র পরিদর্শনের মতো বড়সড় দর কষাকষি, যা গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতি বদলে দিতে পারে।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

৬ বিলিয়ন ডলারের সেই গোপন অ্যাকাউন্ট: আমেরিকার প্রথম ও সবচেয়ে বড় শর্ত

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম 'এক্সিয়োস' দুটি আঞ্চলিক সূত্রের বরাত দিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন এই আলোচনার প্রথম রাউন্ডেই ইরানের সামনে একটি কঠিন শর্ত রেখেছে। আমেরিকা চাইছে, ইরান যেন রাষ্ট্রসংঘের (UN) পরিদর্শকদের তাদের সেই পরমাণু কেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের অনুমতি দেয়, যেখানে আগে আমেরিকা ও ইজরায়েল বোমাবর্ষণ করেছিল বলে অভিযোগ। জুন ২০২৫-এর পর থেকে সেখানে কোনো পরিদর্শন হয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, এর বিনিময়ে আমেরিকা ইরানকে কী দেবে? রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান যদি পরিদর্শকদের পরমাণু কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেয়, তাহলে আমেরিকা কাতারের ব্যাঙ্কে আটকে থাকা ইরানের তহবিলের একটি বড় অংশ ছেড়ে দেবে। এর শুরুটা হবে ৬ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৬০০ কোটি ডলার) একটি অ্যাকাউন্ট দিয়ে, যা ইরান শুধুমাত্র মানবিক প্রয়োজন, অর্থাৎ খাবার ও ওষুধ কেনার জন্য ব্যবহার করতে পারবে।

পাকিস্তানের প্রবেশ এবং ট্রাম্পের 'টোল ট্যাক্স' হুমকি: পর্দার আড়ালের খেলা

এই মেগা-আলোচনাকে সফল করতে শুধু আমেরিকা বা ইরানই নয়, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানও পুরো শক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নিজে এই গোপন বৈঠকে অংশ নিতে বারগেনস্টকে পৌঁছেছেন। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আলোচনার মধ্যেই 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এমন একটি পোস্ট করেছেন যা উত্তেজনাকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে। ট্রাম্প পরিষ্কার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, এই ৬০ দিনের আলোচনার সময় হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর ওপর কোনো ট্যাক্স লাগবে না। কিন্তু যদি এই চুক্তি ব্যর্থ হয়, তাহলে আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার 'গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল' ভূমিকার জন্য অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের সমস্ত খরচ উসুল করতে হরমুজ প্রণালীতে মোটা অঙ্কের 'ইউএস টোল ট্যাক্স' বসাবে।

'বিবি'-র রাজনৈতিক চাপ: ট্রাম্প ও ভ্যান্সের খেলা কি ইজরায়েল ভেস্তে দেবে?

এই পুরো আলোচনা সফল হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা এবং সংশয় তৈরি হয়েছে ইজরায়েলের দিক থেকে। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্টে এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর (যিনি 'বিবি' নামেও পরিচিত) ওপর হিজবুল্লার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। লেবাননে ইজরায়েলি সেনা মোতায়েন রাখার ওপরই তার চেয়ার টিকে আছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতা বাঁচাতে ইচ্ছাকৃতভাবে এই মার্কিন-ইরান আলোচনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। লেবাননে ক্রমাগত ইজরায়েলি হামলা এবং তার জবাবে ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এটাই প্রমাণ করে যে, এই শান্তি আলোচনা যেকোনো মুহূর্তে একটি নতুন বড় যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। সুইজারল্যান্ডে জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে চলা এই বৈঠক সফল হবে কি না, সেই দিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।