ছবি আঁকা থেকে মন সরিয়ে যাত্রাপালা লেখায় ডুবেছিলেন অবন ঠাকুর। জোড়াসাঁকোর বাড়তে নাটকে অভিনয় করেছেন বহুবার। রবিকা যে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’য় বাল্মীকি হয়েছিলেন, তাতে ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ হয়েছিলেন ডাকাত। এরপর ‘ডাকঘর’-এ সেজেছিলেন মোড়ল। 

যখনই রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করতেন তখন মঞ্চসজ্জা থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাজসজ্জার ভার পড়ত তাঁর ওপর। নিজে অভিনয় করতে গিয়ে সবসময় কমিক পার্ট নিতে ভালোবাসতেন। কমিক চরিত্রে এত ভাল অভিনয় করতেন যে রবিকা স্রেফ তাঁর কথা ভেবেই অনেক নাটকে একটি করে কমিক চরিত্র রাখতেন।

 

 

আরও পড়ুন, রাজ্যকে সেরা করার লক্ষ্যে বঙ্গেই থাকতে চান ইউপিএসসি-র সফল এই দুই কলকাতাবাসী


শুধু কি তাই, শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ প্রায়ই আসতেন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে অভিনয় সংক্রান্ত আলোচনা ও পরামর্শ নিতে। অবনীন্দ্রনাথকে তাঁদের নাটক দেখাতে নিয়ে যেতেন। 

একদিন দক্ষিণের বারান্দায় তাঁর প্রিয় বর্মা কাঠের নকশা করা চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছেন, মোহনলাল এসে দাদামশায়কে ধরলেন; নাটক লিখে দিতে হবে। ওরা নাটক করবে। কিন্তু কি নাটক লিখবেন। তখন তো নিজেই যাত্রার পালা লিখছেন। কিন্তু মোহনলালের আবদার তো এড়াতে পারেন না। অগত্যা দাদামশায় নিজের লেখা ‘এসপার ওসপার’ নাটকটিকে যাত্রার পালায় লিখতে শুরু করলেন। 

পালা লেখা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল। এরপর শুরু করে দিলেন মহড়া। ক’দিন মহড়া চলার পর তা সাড়ম্বরে অভিনয় হল। তারপর একদিন জোড়াসাঁকোর দোতলার হলঘরে জ্বলে উঠল হ্যাজাকের আলো। পর পর তিনদিন সে পালার অভিনয় হল। শেষ দিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এলেন যাত্রা দেখতে। পালা শেষ হলে বললেন, ‘এ জিনিস অবন ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না’। 

আরও পড়ুন, সুখবর, লকডাউনের মধ্যেই চেন্নাই থেকে শহরে এল মেট্রোর নতুন এসি রেক

তখন তাঁর মন পালা লেখার নেশায় মত্ত। একে একে ধরলেন হিতোপদেশের গল্পগুলি। প্রথম হিতোপদেশের গল্প নিয়ে পালা বাঁধলেন ‘উড়নচন্ডীর পালা’। তারপর চলল কথামালা, পঞ্চতন্ত্র, ঈশপের গল্প নিয়ে বেঁধে চললেন যাত্রার পালা, গান রচনা।

এরপর একদিন সরে এলেন হিতোপদেশ-পঞ্চতন্ত্র-ঈশপের গল্প থেকে। সেই সময় প্রকাশ হচ্ছিল রাজশেখর বসুর গল্প। দারুন জনপ্রিয়তা পাচ্ছিল। একে একে পড়ে ফেলেছেন সেসব গল্প। তার থেকেই বেছে নিলেন রাজশেখর বসুর ‘লম্বকর্ন’কে। রূপ দিলেনপালায়। তারপর ‘জাবালি’। এক এক করে অনেকগুলি গল্পকে যাত্রা পালায় বেঁধে ফেললেন। কথায়, গানে সেই গল্পগুলি পালায় হয়ে উঠল অনবদ্য। 

একটা করে পালা লেখেন আর নাতি নাতনিদের পড়ে শোনান। নাতি নাতনীরাও খুব খুশী। তখন এভাবেই অবনীন্দ্রনাথের দিন কাটত। ছবিতে আর তেমন করে মন বশছিল না। কেউ ছবি আঁকার কথা বললে অবনীন্দ্রনাথ বেশ বিরক্ত হতেন। সেটা বোঝাও যেত। কারন মুখ গম্ভীর করে বসে থাকতেন। তাই দেখে একদিন রবিকা বললেন, ‘অবন তোমার হলটা কী? ভাইপো বললেন, ‘কী জানো রবিকা, এখন যা ইচ্ছে করে তাই এঁকে ফেলতে পারি। সেই জন্যেই আর আঁকায় মন বসেনা। আমার মন এখন নতুন খেলায় ব্যস্ত’। সেই নতুন খেলাতেই অবনীন্দ্রনাথের কেটেছিল কয়েক বছর। যাত্রা পালা লিখে, ঢোল বাজিয়ে বাড়ির ছোট বড় সকলকে নিয়ে মহড়া দিয়ে, অভিনয় চালিয়েছিলেন অবনীন্দ্রনাথ।

আরও পড়ুন, 'তেরো পার্বণ'র হাত ধরে বিনোদনে ভিন্নতার ছোঁয়া, হঠাৎই হল এক স্বাদবদল

 রামায়ণের কাহিনিতেও ঝুঁকেছিলেন। নিজের সংগ্রহের রামায়ণ বইটা তখন যেমন পুরনো তেমনি ছেঁড়া ফাটা। বাড়ির কাজের লোক রাধুকে ডেকে একদিন বললেন, এই ছেঁড়া রামায়ণটা বাঁধিয়ে আনাতে পারিস। রাধু রামায়ণ বাঁধিয়ে আনল। একদিন রামায়ণ কাহিনী নিয়ে পালা লেখা শেষ করলেন। কিন্তু তাঁর নিজেরই মন ভরল না। বেশ কয়েকবার লখে লখে ছিঁড়ে ফেললেন। 

নিজেই ধরে ফেললেন গলদটা কোথায়। আসলে কাহিনীকে পয়ারের ছাঁদ থেকে বের করে আনতে হবে। তা না করতে না পারলে যাত্রাপালা ঠিক জমছে না। অনেক কাটছাঁট করে পয়ারকে বেঁধে ফেললেন গদ্যে। ঠিক পুঁথির মতো করে। তারপর সেই পুঁথির রামায়ণ কাহিনী যাত্রা পালায চলল গড়গড়িয়ে।তখনও কাজের লোক রাধু রোজ নিয়ম করে জার্মান সিলভারের গোল গামলাটাতে জল ভরে রাখে। অবনীন্দ্রনাথ ছবি আঁকবেন বলে। কিন্তু অবনীন্দ্রনাথের সে সবে ধ্যান নেই। তিনি যে ছবিকে ছুটি দিয়েছেন। তাই খালি গামলা পড়ে থাকে। রাধু একদিন তাই রাগ করে গামলাখানাই উল্টে রাখলেন।