লকডাউনে সোনারপুরের হোমে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের প্রকাশ্য়ে আনায় এবার তৃণমূলের সাংসদ মিমি চক্রবর্তী ও বারুইপুরের এসপি রসিদ মুনির খানের বিরুদ্ধে সরব হলেন সিপিএমের রাজ্য়সভার সাংসদ বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। লকডাউন ভেঙে এইডস আক্রান্তদের সামনে আনায় দুজনের ওপর 'যার পর নাই' চটেছেন এই বাম নেতা। বিকাশবাবু বলেন, সামাজিক বিপদের সময় আত্মপ্রচারে ব্যস্ত থেকে এরা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। 

একবার নয়, লকডাউন ভাঙা নিয়ে রাজ্য়কে দুবার চিঠি পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। বাংলার বুকে যে লকডাউন ঠিকভাবে মানা হচ্ছে না তা জায়গার নাম উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি চিঠিতে বলেছে মন্ত্রক। কিন্তু পরপর দুটো চিঠি পেয়েও হুঁশ ফেরেনি রাজ্য়ের। সম্প্রতি তারই সাক্ষী থাকল সোনারপুর। যেখানে এইডস আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে লকডাউন ভেঙে অনুষ্ঠান করা হল। অনুষ্ঠানে মানা হয়নি লকডাউনের কোনও নিয়ম। 

আরও পড়ুন- বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিচ্ছি, সোনারপুরের এইচআইভি হোমকাণ্ডে বললেন মন্ত্রী শশী পাঁজা

এশিয়ানেট নিউজ বাংলার এই খবর প্রকাশ্য়ে আসতেই বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন সিপিএমের রাজ্য়সভার এমপি বিকাশবাবু। এদিন তিনি  বলেন, 'মিমি চক্রবর্তী তো ওই দলের একজন এমপি মাত্র। উনি তো গ্ল্য়ামারাস ওয়ার্ল্ডের লোক। স্বভাবতই ভেবেছেন এরকম একটা সময়ে লোকজন জড়ো করে কী একটা বিশাল কাজ করছি। এরকম একটা সামাজিক বিপদের সময় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় নিজেই নিয়ম ভাঙছেন। তাই তো ওনার দলের লোকজন সেটা করবে, এটাই স্বাভাবিক। এই সময় সামজিক দায়িত্ব পালন না করে অনেকেই আত্মপ্রচারে ব্যস্ত থাকেন। এই ঘটনা সমাজের জন্য় খুবই বিপজ্জনক।'

এই বলেই অবশ্য় থেমে থাকেননি সিপিএমের রাজ্য়সভার সাংসদ। তিনি বলেন,' এটা শাসক দলের একটা অপচেষ্টা। অবৈজ্ঞানিক মানসিকতার প্রতিফলন।' তবে সোনারপুর হোমের এইচআইভি আক্রান্তদের প্রকাশ্য়ে আনার জন্য় বারুইপুরের পুলিশ সুপার রসিদ  মুনির খানকেও একহাত নেন বিকাশবাবু। তিনি বলেন,'যে যে অফিসাররা এই ধরনের ঘটনার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে ফেলছেন, তারা নিজেদের অযোগ্য়তা প্রমাণ করছেন। এরজন্য় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। এত লক্ষ কোটি টাকা এই প্রশাসনের ওপর খরচ করার একটাই কারণ, এরা আইন মেনে সমাজটাকে একটা লক্ষ্য়ে পৌঁছে দেবে।  প্রশাসনের কর্তারা যদি নেতাদের কথা ভেবে নিয়ম নীতির বাইরে চলে যান , তাহলে তারা ওই পদে থাকার যোগ্য় নন। তাদের সরিয়ে দিতে হবে।' 



সোনারপুরের হোমকাণ্ড বলছে, এইচআইভি আক্রান্তদের ছবি ফেসবুকে ফলাও করে পোস্ট করেছেন বারুইপুরের এসপি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুসারে কোনওভাবেই এইচআইভি পজিটিভদের পরিচয়, এমনকী ফেসিয়াল রেকগনিশনও পাবলিকলি প্রচার করা যায় না। এক্ষেত্রে এমন দায়িত্ব জ্ঞানহীন কাজ কীভাবে সংঘটিত হল? এর কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তবে, এই ঘটনায় মূলত তিনটি দিকে আঙুল উঠেছে- যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ মিমি চক্রবর্তী, বারুইপুরের এসপি রশিদ মুনির খান এবং অবশ্যই শিশু-রা যে হোমে থাকে তার প্রধান কল্লোল ঘোষ-এর দিকে। 

যদিও, কল্লোল ঘোষ যাবতীয় অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, লকডাউনের পুরো নিয়ম এবং সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-এর নিয়ম মানা হয়েছিল। তাহলে যে ছবি এবং ভিডিও এশিয়ানেট নিউজ বাংলার হাতে এসেছে সেখানে কোথাও সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানার ছবি ধরা পড়েনি। উল্টে দেখা গিয়েছে অধিকাংশ ছবিতেই শিশুদের মুখে মাস্ক বা গ্লাভস নেই। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন খোদ বারুইপুর জেলার এসপি রশিদ মুনির খান এবং তাঁর দলবল। এমনকী এই ভিড়ের মধ্যে ছিলেন সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর প্রতিনিধিরাও। এনজিও-র প্রধান কল্লোল ঘোষ আবার জানেন না যে তাঁর হোমের শিশুদের ছবি ফেসবুকে পোস্ট হয়ে যাওয়ার কথা। এইআইভি আক্রান্ত শিশুদের ছবি কীভাবে পাবলিকলি পোস্ট করে দেওয়া হল- তার কোনও উত্তর তিনি দিতে পারেননি।  

আরও পড়ুন- প্রচারের লালসা, 'এইচআইভি হোম কাণ্ডে' মিমি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে তোপ দিলীপের

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে সোনারপুরের এই হোমে একটি অনুষ্ঠান রাখা হয়। যেখানে এইআইভি পজিটিভ শিশুদের জন্য নানাধরনের উপহার নিয়ে হাজির হন রশিদ মুনির খান। যিনি বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার। তাঁর সঙ্গে তাঁর অধস্তন অফিসাররাও ছিলেন। ছিলেন সোনারপুর থানার আইসি-ও। এদিকে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর-ও সেখানে হাজির হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু, লকডাউনের কথা ভেবে তিনি শেষমুহূর্তে সেখানে যাওয়া বাতিল করেন। পরিবর্তে তিনি তাঁর আপ্ত-সহায়ক অনির্বাণ ভট্টাচার্য-কে সেখানে পাঠান শিশুদের জন্য পোশাক নিয়ে। এই অনুষ্ঠানের জন্য মিমি আবার ভিডিও শ্যুট-ও করেও হোম কর্তৃপক্ষকে পাঠান। আবার পুরো অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে মিডিয়া, ক্যামেরাম্যান সবাইকে ডাকা হয়। একদল মানুষ মুহূর্তের মধ্যে সেই হোমের মধ্যে ঢুকে পুরো অনুষ্ঠানকে ক্যামেরাবন্দি করে রাখে। এই পরিস্থিতি-র মধ্যেই এইচআইভি শিশুরা ঘোরাফেরা করে। বলতে গেলে হোমের ভিতরে এক মেলা বসে যায়। করোনাভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে একসঙ্গে যে কোনও জমায়েতের উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করে রাখা হয়েছে। এমনকী, বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে লকডাউন-২-এর যে নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে তাতেও যে কোনও ধরনের জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রাখার কথা বলা হয়েছে। অথচ, একজন দায়িত্ববান জনপ্রতিনিধি হিসাবে সাংসদ মিমি চক্রবর্তী এবং একজন দায়িত্ববান পুলিশ অফিসার হিসাবে রশিদ মুনির খান কীভাবে এই বিষয়গুলি ভুলে গেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকী, হোমের প্রধান কল্লোল ঘোষ-ও বা কীকরে এমন এক জটিল পরিস্থিতি এতগুলো শিশুকে একদল বহিরাগত যারা হোমের ভিতরে সঠিকভাবে স্যানিটাইজেশন প্রবেশ করেছিল তাদের সামনে বের করেছেন- তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।  

আরও পড়ুন- 'দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত', এইচআইভিকাণ্ডে মিমি ও রশিদের বিরুদ্ধে তোপ রঞ্জিত শূর-এর

এমনকী, অভিনেত্রী তথা সাংসদ মিমি চক্রবর্তী আসতে পারেন শুনে আশপাশের এলাকা থেকেও অসংখ্য মানুষ হোমের সামনে ভিড় করেছিলেন। খোদ হোমের প্রধান কল্লোল ঘোষ জানিয়েছেন, ভিড়় দেখে কোলাপসেবল গেটের একটা অংশ খুলে সেখান দিয়ে এসপি এবং সাংসদের প্রতিনিধিদের ভিতরে প্রবেশ করানো হয়েছিল। এমন এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি- তাও আবার তার সাক্ষী খোদ পুলিশ সুপার! স্বভাবতই পুরো ঘটনাকেই একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতা-র বলে দাবি করা হচ্ছে। নাম ও পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি আধিকারিকও জানিয়েছেন, কোনওভাবেই এইআইভি পজিটিভদের পরিচয়-কে পাবলিকলি প্রকাশ করা যায় না। এক্ষেত্রে আর এটা করা যায় না কারণ এরা সকলেই নাবালক।  

আরও পড়ুন- লকডাউন নিয়মকে তুড়ি মেরে এইচআইভি শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠান, বিতর্কে সাংসদ মিমি ও এসপি