মহিষাসুরসংহারিণী নারায়ণীর আগমনে প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটি চিত্রকলাকে পুনরায় প্রাচীনত্ব এবং আধুনিকতার মেল বন্ধনে তুলে ধরছে দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীনের বহু পরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত শিল্পী প্রশান্ত ভাঁড়। এবারের বিষয় এক সময়ের বিখ্যাত এবং বর্তমানে প্রায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ‘চালচিত্র’। শিল্পীদের ভাষায় যা ‘প্টলেখা’ ,‘দুর্গা চালা’ বা ‘দেবীচালা’ নামেও পরিচিত। এই চালচিত্রের ইতিহাস প্রায় ১২০০ বছরের পুরানো।তৈরির সাবেকি উপকরণের মধ্যে বাঁশ, মোটা কাপড়, কাদা, প্রধানত প্রাকৃতিক রং এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দক্ষিণ বঙ্গের বীরভূম জেলার হাটসেরান্দির সূত্রধর সমাজে এই ধরনের দুর্গা পটের প্রচলন এখনো দেখতে পাওয়া যায়। আবার কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজ্যেশ্বরী দুর্গা চালচিত্রের মধ্যে সাবেকিআনাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়। 

আরও পড়ুন- নাম লেখাননি এখনও, দেরি না করে অংশ নিন এশিয়ানেট নিউজ শারদ সম্মান ২০১৯-এ
চালচিত্রের মূল বিষয় শিব, দুর্গা, কৈলাস, নন্দীভৃঙ্গী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শুম্ভ-নিশুম্ভ, মহিষাসুর বধ, দশাবতার কাহিনীকে চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা। দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীন দুর্গা পূজা এবার মূল বিষয় বস্তুকে এক রেখে প্রাচীনত্বকেই আধুনিকতার ছাঁচে ফেলে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। 
চালচিত্র আসলে দেবী প্রতিমার চালির উপরিভাগে অর্ধ গোলাকৃতি বাসের খাঁচা, এই খাঁচার উপর মোটা কাপড় লাগিয়ে মাটি লেপে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে খড়ি গোলার কয়েকটি আস্তরণ দেওয়া হয়। পুরো গঠনটা সম্পূর্ণ ভাবে তৈরি হয়ে গেলে এর পরে পরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন শিল্পী নিজের মত করে কাহিনীমূলক চিত্র অঙ্কন করে। 
চিত্র অঙ্কনের ক্ষেত্রে সাবেকি যে রং ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা মূলত প্রাকৃতিক রং, যা বাংলার পটচিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট। রঙের মধ্যে লালা, হ্লুদ, সাদা, খয়েরি, নীল, কালো ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এই সমস্ত রঙের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে মেটে সিন্দুর, পিউরি, খড়ি মাটি, ভূষকালি ইত্যাদি। 

আরও পড়ুন- আজও নিষ্ঠার সঙ্গে হাটখোলার দত্ত বাড়িতে পূজিত হন মা, চালা-ই বলে চণ্ডীর কাহিনী
শিল্পী প্রশান্ত ভাঁড় আমাদের জানান, এবারের মন্ডপকে দূর থেকে দেখে মনে হবে একটি চালচিত্র যেন মাঠের মধ্যে হেলিয়ে রাখা আছে। মন্ডপের ভেরতেরও চালচিত্রের অবাধ বিচরণ লক্ষণীয় বিষয় হতে চলেছে। তবে এ ক্ষেত্রে শুধু মাত্র সাবেকি রীতি মেনেই নয়, সাথে করে আধুনিকতার ছোঁয়াও থাকবে। সাবেকি চালচিত্রের অর্ধ চন্দ্রাকৃতি রীতিকে সঙ্গে নিয়ে নানা ধ্রনের আকৃতির সংমিশ্রণে এক অভিনবত্বের ছোঁয়া থাকছে এবারের দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীন দুর্গোৎসবে। 
এই সম্পূর্ণ ভাবনা এবং তার বাস্তব রূপদানের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় ৭ মাস আগে থেকে। বিগত ৭ মাস ধরে প্রধান শিল্পীর তত্বাবধানে আরো প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন ভেতরে এবং বাইরে ২০ জন মত কাজ করে চলেছে। এই চালচিত্রে শুধু চিত্রই নয়, সঙ্গে করে আলোক সজ্জা যে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। 
দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীন পুজো যে এক অন্য মাত্রা যোগ করবে বাংলা তথা কলকাতার পুজোতে , তা নিয়ে আয়োজক এবং শিল্পীর সকলেই প্রত্যয়ী।
কিভাবে যাবেন-
উত্তর কলকাতা এবং গড়িয়ার দিক থেকে যারা আসবেন , তারা মেট্রো করে কালী ঘাট মেট্রো স্টেশানে নেমে গড়িয়া হাটের অটো ধরে পৌঁছে যেতে পারবেন।
ট্রেনে করে যারা আসবেন দক্ষিণ ২৪ পরগণা থেকে তারা নিউ গড়িয়া স্টেশানে নেমে মেট্রো করে আগের মতই কালী ঘাট মেট্রো স্টেশানে নেমে গড়িয়া হাটের অটো ধরে পৌঁছে যেতে পারবেন।
দেশপ্রিয় পার্ক সার্বজনীন পুজো দেখার সঙ্গে সঙ্গে আপনারা দেখতে পারবেন –
১। ত্রিধারা সম্মিলনী
২। একডালিয়া এভারগ্রীন 
৩। বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশান
৪। সিংহী পার্ক সার্বজনীন
৫। হিন্দুস্তান পার্ক সার্বজনীন