তপন মল্লিক- একজন অভিনেতার সঙ্গে রয়েছি বেশ কিছুক্ষণ অথচ এখনকার সিনেমা, থিয়েটার এমনকি অভিনয় নিয়ে একটি শব্দও কেউ খরচ করিনি। অন্যজনের তো করার কথাই নয়, কারণ অকারনে তিনি সেসব নিয়ে কেনই বা কথা খরচ করবেন। আর আমারও কোনও আগ্রহ ছিল না। তাছাড়া আমরা কেউ সেদিন ওই মুহুর্তে কোনও টেলিভিশন বা সিনেমার স্যুটিং অথবা নাটকের রিহার্সালে হাজির ছিলাম না। তিনি আদ্যন্ত একজন পেশাদার অভিনেতা হলেও এসেছেন নতুন একটি গ্যালারি বা ছবি ভাস্কর্যের প্রদর্শশালার উদ্বোধন করতে। আর আমি পেশা সূত্রে আমন্ত্রণ পেয়ে হাজির হয়েছিলাম অন্য এক সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পাব-এই আশায়। দুজনেই নির্ধারিত সময়ের খানিক আগে পৌঁছে যাওয়ায় নতুন প্রদর্শশালার একটি বিশেষ ঘরে বসেছিলাম। 
উদ্যোক্তারা আমাদের দু’জনকে দু’কাপ কফি দিয়ে যান, সেই কফি মগে চুমুক দিতে দিতে আমরা খানিকটা সময় কাটাই অকাজের দু-একটি কথাতেই। কিন্তু খানিক পরেই আমরা বুঝি অনুষ্ঠান শুরু কিংবা অন্যান্যদের আসতে আরও দেরি আছে। আমি ভাবছিলাম এবার তাহলে একটা কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়াই যায়। কিন্তু কোন বিষয়? 

আরও পড়ুন-না ফেরার দেশে 'পুলু', সৌমিত্রর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ পৈত্রিক ভিটে কৃষ্ণনগর


বৈদ্যুতিন মাধ্যমের প্রতিনিধি হওয়ায় আমার সঙ্গে ছিল ক্যামেরাম্যান। সে তখন বাইরে। সৌ্মিত্র চট্টোপাধ্যায় একটা বহু পুরনো বাংলা পর্যটন পত্রিকার পাতা ওলটাচ্ছেন। মাঝপথে বিরক্ত হয়েই পত্রিকাটি বন্ধ করে বললেন, এত বানান ভুল...। আমি আচমকাই ওঁকে একটা প্রশ্ন করে বসি, আপনি মনে হয় বেড়াতে যেতে খুব একটা পছন্দ করেন না। সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলেন, ‘তা কেন, কে না চেনা জানা গন্ডি ছেড়ে অন্তত একদিনের জন্য হলেও বেড়িয়ে পড়তে চায়। কিন্তু ছুটি চাই, সেটা তো সহজে মেলে না। আর আমার বয়সে তো একটু ছুটি মানে একটু বিশ্রাম’। 
বুঝতে পারছি উনি বিষয়টাকে গভীরভাবেই নিয়েছেন। আমি ওঁকে আরও খানিকটা উস্কে দিতে বলি, আচ্ছা কালকূট ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে’-তে একধরণের আত্ম-উপলব্ধির কথা লিখেছেন। নদী-পাহাড়-জঙ্গল-সমুদ্রে গিয়ে আপনার কি কখনো সে রকম কোনও উপল্বদ্ধি হয়েছে? সপাটে জবাব, ‘না না, বেড়াতে গিয়ে সে রকম কোনও উপলবদ্ধি-টব্ধি আমার কোনদিন হয়নি। তাছাড়া আত্ম-উপলব্ধির জন্য টাকা পয়সা খরচ করে সমুদ্র কিংবা পাহাড়ে যাওয়ার দরকার পরে কি? দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততার মাঝে এমনকি ভিড় বাসে ট্রামে চড়ে যাতায়াতের পথেও তো আত্ম-উপলব্ধি হতে পারে। তবে একথা খুবই ঠিক যে আমরা সাধারনত বেড়াতে যাই প্রকৃতি নির্ভর অর্থাৎ পাহাড় কিংবা অরণ্য কিংবা সমুদ্রের কাছে, যেখানে যাওয়ার পর মানুষের মনের চোখ খুলে যায়। 

আরও পড়ুন-'এই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন', সৌমিত্রর প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ রাজ্যপালের
পাহাড় না সমুদ্র কোনটা আপনার বেশি প্রিয়, বেড়াতে যেতে সবথেকে কোন জায়গাটিকে আপনি বেশি পছন্দ করেন? ‘না, এর উত্তর আমি দিতে পারব না, কারন এর উত্তর আমার কাছে নেই। পৃথিবীতে এত এত সুন্দর এবং অদ্ভুত সব জায়গা আছে যে তার মধ্যে থেকে একটি বেছে নেওয়া খুব মুশকিল। আর অন্যগুলিকে কিজন্য বাদ দেব তাও তো আমি নিজেই জানি না। পাহাড়-অরণ্য-সমুদ্র-মরুভূমি প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব সৌন্দর্য, তেমনই আবার প্রত্যেকেরই রয়েছে বৈচিত্র। বলতে দ্বিধা নেই যে আমার মনও বৈচিত্রের অভিলাষী। তা স্বত্বেও অরণ্য আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। অরণ্যের গভীরতা, তার প্রাণী সম্পদ আমাকে খুব টানে। এর অবশ্য একটা সংযত কারণ রয়েছে। আমার বাবার ছিল বদলির চাকরি। সেই সূত্রে আমরা বেশ কিছুদিন দার্জিলিঙ্গে ছিলাম। ওই সময় আমি ডুয়ার্স, তরাই, দার্জিলিঙ্গের পাহাড়ি এলাকা এমনকি সিকিমের বেশ খানিকটা অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তখন ছোট হলেও খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেছি অরণ্যের মায়াময় পরিবেশ, তার রং-রূপ এবং বৈচিত্র। তখন থেকেই ওই সব অঞ্চল আমাকে এত বেশি করে ডাকত যে যখনই সময় পেয়েছে আমি ছুটে ছুটে গেছি ডুয়ার্সের অরন্যে’।


শুধু কই ডুয়ার্সের জঙ্গলই ভাল লাগে? ‘না ঠিক তা নয়। ডুয়ার্সের জঙ্গলের সঙ্গে চেনা-জানা ছোটবেলা থেকে, তার সঙ্গে অন্য সখ্যতা তবে আমার নিজের খুব ভাল লাগে উত্তর ভারতের জঙ্গল। কারণ হিসেবে বলতে পারি, এখানকার জঙ্গলে আন্ডারগ্রোথ খুব কম আর উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে সেতা খুব বেশি।তবু ভাল লাগে। বিহার বা ঝাড়খন্ডের জঙ্গলও ভাল লাগে কিন্তু করবেট জাতীয় উদ্যান যাওয়া হয়নি। ঘুরে ফিরে সেই উত্তরবঙ্গেই যাই। জলদাপাড়া, খুটিমারি, চাপড়ামারি আমার খুব প্রিয়। নির্জন জঙ্গলে ঘোড়াঘুড়ি নয়, চুপচাপ বসে থাকতেই আমার ভাল লাগে’।