অ্যান্টার্কটিকার টেলর গ্লেসিয়ার থেকে ঝরে পড়া টকটকে লাল জলধারা, যা "ব্লাড ফলস" নামে পরিচিত, বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয়। এর উৎস ১৫ লক্ষ বছরের পুরনো এক লবণাক্ত হ্রদ, যার লোহা সমৃদ্ধ জল বাতাসের সংস্পর্শে এসে লাল বর্ণ ধারণ করে।
পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে নিস্তব্ধ আর সবচেয়ে ঠান্ডা জায়গা হল অ্যান্টার্কটিকা। এখানে মাইলের পর মাইল শুধু সাদা বরফ আর নীলচে হিমবাহ। দিনের পর দিন সূর্য ওঠে না, তাপমাত্রা নেমে যায় মাইনাস ৫০ ডিগ্রিতেও। এই কঠিন পরিবেশের মাঝেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত আর সুন্দর একটা দৃশ্য। নাম তার "Blood Falls" বা রক্তের জলপ্রপাত।

প্রথম দেখায় যে কারও মনে হবে বিশাল বরফের দেওয়াল ফুঁড়ে টাটকা রক্ত বেরিয়ে আসছে। লাল জলধারা গড়িয়ে পড়ছে নিচের হিমায়িত লেকের উপর। এই দৃশ্য এতটাই অবিশ্বাস্য যে প্রথমে বিজ্ঞানীরাও ভেবেছিলেন এটা কোনো অলৌকিক ঘটনা।
Blood Falls ঠিক কোথায় অবস্থিত? এই রহস্যময় জলপ্রপাতটি রয়েছে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার "McMurdo Dry Valleys" নামের এক অদ্ভুত উপত্যকায়। এই জায়গাটাকে পৃথিবীর "মঙ্গল গ্রহের মতো" জায়গাও বলা হয়। কারণ এখানে ২০ লক্ষ বছর ধরে বৃষ্টি হয়নি। উপত্যকার বুক চিরে বয়ে গেছে "Taylor Glacier" নামের এক বিশাল হিমবাহ। সেই হিমবাহের একদম শেষ প্রান্ত, যেখানে বরফ এসে "Lake Bonney" এর সাথে মিশেছে, সেখান থেকেই ফোঁটা ফোঁটা করে লাল জল বেরিয়ে আসছে।
জায়গাটি এতটাই দুর্গম যে সেখানে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হল বিশেষ হেলিকপ্টার। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ১৯১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ভূতত্ত্ববিদ Thomas Griffith Taylor তার অভিযানের সময় প্রথম এই জলপ্রপাতটি দেখতে পান। তার নাম অনুসারেই এই হিমবাহের নামকরণ করা হয়।
১০ বছরের পুরনো প্রশ্ন: জল লাল কেন? প্রায় ১০ বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মাথা ঘামিয়েছে এই একটা প্রশ্ন। প্রথমে মনে করা হয়েছিল লাল রঙের শৈবালের জন্য জল লাল। পরে মনে করা হল আয়রন অক্সাইডের জন্য। কিন্তু আসল উত্তর মিলল ২০১৭ সালে। NASA এবং University of Alaska Fairbanks এর একদল বিজ্ঞানী ড্রোন, রাডার আর কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস করে পুরো রহস্যের জট খুললেন।
তারা জানালেন, Blood Falls এর জল আসলে ১৫ লক্ষ বছর আগের একটা আটকে পড়া লবণাক্ত লেকের জল। Taylor Glacier এর নিচে প্রায় ৪০ মিটার গভীরে এই লেক চাপা পড়ে ছিল। লক্ষ বছরে সেই জলে সমুদ্রের জলের থেকেও ৩ গুণ বেশি লবণ এবং প্রচুর পরিমাণে লোহা জমা হয়েছিল। যেহেতু সেখানে অক্সিজেন ছিল না, তাই লোহা মরচে ধরতে পারেনি।
এখন হিমবাহের সরু ফাটল দিয়ে সেই অতি লবণাক্ত এবং ঘন জল যখন বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে আসে, তখনই ঘটে আসল ম্যাজিক। অ্যান্টার্কটিকার বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে আসা মাত্রই লোহা অক্সিডাইজ হয়ে যায়। আর তখনই সাদা বরফের উপর দিয়ে লালচে-কমলা রঙের "মরচের" জল বয়ে যায়। অনেকটা পুরনো লোহার পাইপে জল লাগলে যেমন লাল হয়ে যায়, ঠিক সেরকম।
এলিয়েন খোঁজার সবচেয়ে বড় সূত্র: বিজ্ঞানীদের কাছে Blood Falls এর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হল অন্য জায়গায়। এই লবণাক্ত এবং অক্সিজেনহীন জলে তারা এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া খুঁজে পেয়েছেন যা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। এই ব্যাকটেরিয়াদের বাঁচার জন্য সূর্যের আলো বা অক্সিজেনের দরকার হয় না। তারা সালফার আর লোহা খেয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি তৈরি করে বেঁচে থাকে।
NASA এর বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, মঙ্গল গ্রহের বরফের নিচে বা বৃহস্পতির উপগ্রহ "Europa" এর বরফে ঢাকা সমুদ্রে যদি কোনো প্রাণ থাকে, তাহলে তারা এই ব্যাকটেরিয়ার মতোই হবে। কারণ সেখানকার পরিবেশও Blood Falls এর মতোই ঠান্ডা, অন্ধকার এবং অক্সিজেনহীন। তাই এখন Blood Falls কে "Astrobiology" এর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরি বলা হয়। বিজ্ঞানীরা এখান থেকেই ভবিষ্যতে এলিয়েন প্রাণ খোঁজার ফর্মুলা তৈরি করছেন।
সুতরাং, Blood Falls কোনো ভূতের গল্প বা সিনেমার দৃশ্য নয়। এটা হল ১৫ লক্ষ বছরের পুরনো পৃথিবীর ইতিহাস। লবণ, লোহা, অক্সিজেন আর অণুজীবের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন।
এই একটা জলপ্রপাতই আমাদের শিখিয়ে দেয় পৃথিবীতে এখনও কত অজানা রহস্য লুকিয়ে আছে। আর সেই রহস্যই হয়তো একদিন আমাদের অন্য গ্রহে প্রাণের খোঁজ দেবে।


