সারাদিন চেয়ারে বসে কাজ করেন? জানলে অবাক হবেন, এই অভ্যাস আপনার হার্টের রোগ থেকে শুরু করে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ধূমপানের বিপদ নিয়ে আমাদের সচেতন করে আসছেন। কিন্তু এখন তাঁরা আমাদের আরও একটি দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে আঙুল তুলছেন, যা হয়তো অলক্ষ্যেই আমাদের স্বাস্থ্যের বিরাট ক্ষতি করছে। আর সেটা হলো, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকা।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

আধুনিক জীবনে আমরা প্রায় দশ ঘণ্টা পর্যন্ত বসে কাটাই—কখনও অফিসের ডেস্কে, কখনও মিটিংয়ে, আবার কখনও ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও, বিভিন্ন নামকরা মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সঙ্গে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ (হৃদরোগ), টাইপ ২ ডায়াবেটিস, এমনকি অকাল মৃত্যুর মতো গুরুতর সমস্যার সরাসরি যোগ রয়েছে। দ্য কনভারসেশন-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন।

সাধারণত স্বাস্থ্য সচেতনতার মানেই আমরা বুঝি ভালো খাওয়া-দাওয়া আর নিয়মিত ব্যায়াম। যদিও এই দুটোই খুব জরুরি, কিন্তু গবেষকরা বলছেন, পুরো গল্পটা এত সহজ নয়। একজন ব্যক্তি হয়তো নিয়ম করে ব্যায়াম করেন, কিন্তু দিনের বেশিরভাগ সময় যদি তিনি বসেই কাটান, তাহলেও তাঁর স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যায়।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা (physical inactivity) মানে হলো যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম না করা। অন্যদিকে, সেডেন্টারি বা আসীন আচরণ (sedentary behaviour) হলো দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে বা শুয়ে থাকার মতো কম শক্তিক্ষয়ের কাজ করা। এই দুটি বিষয় আলাদা এবং দুটিই শরীরের ওপর ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে প্রভাব ফেলে।

যখন শরীর দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকে, তখন বেশ কিছু জৈবিক পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পেশির কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় শরীরের পক্ষে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দিতে পারে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান কারণ। ফ্যাট মেটাবলিজম বা চর্বি হজমের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ায় কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছাতে পারে না। এই পরিবর্তনগুলো ধীরে ধীরে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের দিকে ঠেলে দেয়।

একটানা বসে থাকার অভ্যাস আমাদের হাড় ও পেশিরও ক্ষতি করে। নড়াচড়া কম হওয়া এবং ভুল ভঙ্গিমায় বসার কারণে ঘাড়, কাঁধ এবং পিঠের নীচের অংশে চাপ পড়ে। এই কারণেই অনেক অফিস কর্মী প্রায়শই অস্বস্তি বা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যায় ভোগেন।

এছাড়াও, দীর্ঘক্ষণ নিষ্ক্রিয় থাকলে শরীরের এনার্জি লেভেল কমে যায়, মনোযোগের অভাব দেখা দেয় এবং কাজের সময় প্রোডাক্টিভিটিও কমে যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার যোগসূত্র রয়েছে। যেহেতু প্রাপ্তবয়স্করা তাঁদের দিনের বেশিরভাগ সময় কর্মক্ষেত্রে কাটান, তাই দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপর কর্মক্ষেত্রের একটি বড় প্রভাব থাকে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে বসে থাকার সময় কমানোর জন্য খুব বড়সড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। প্রতি ঘণ্টায় কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়ানো বা হাঁটার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপই স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে।

ব্রিটেনে হওয়া গবেষণা-সহ একাধিক স্টাডিতে দেখা গেছে, স্ট্যান্ডিং ডেস্ক, ওয়াকিং মিটিং (হাঁটতে হাঁটতে মিটিং) এবং নিয়মিত বিরতিতে উঠে হাঁটাচলার মতো কৌশলগুলো প্রতিদিনের বসে থাকার সময়কে অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে। কর্মীরা প্রায়শই এর ফলে কাজে বেশি মনোযোগ, শরীরে বেশি শক্তি এবং কম অস্বস্তির কথা জানিয়েছেন।

নিয়মিত ব্যায়াম করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারে না। সারাদিন ধরে ছোট ছোট, ধারাবাহিক পরিবর্তনই আপনার দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।