সকালবেলা দুজনে একসঙ্গে চা খান, বাজার ভাগ করে করেন, রাতে একই বিছানায় ঘুমোন, বিলও ভাগাভাগি করে দেন। বাইরে থেকে দেখলে পারফেক্ট কাপল। কিন্তু ভিতরে ফাঁকা। না আছে গভীর কথা, না চোখে চোখ রেখে হাসি, না হঠাৎ ছুঁয়ে দেওয়া। শুধু দায়িত্ব আর রুটিন। রিলেশনশিপ এক্সপার্টরা এর নাম দিয়েছেন ‘রিয়্যাল গুড ফ্ল্যাটমেট সিনড্রোম’।
“আমরা একসঙ্গে থাকি, কিন্তু মনে হয় দুটো প্যারালাল লাইফ চলছে।" এটাই এখনকার ভাইরাল লাইন। মুম্বইয়ের রিলেশনশিপ থেরাপিস্ট ডা. নেহা মেহতা বলছেন, তার চেম্বারে আসা প্রতি ১০ জন কাপলের মধ্যে ৬ জন এই ‘ফ্ল্যাটমেট সিনড্রোম’-এ ভুগছেন।

কী এই সিনড্রোম?
সহজ ভাষায়, যখন স্বামী-স্ত্রী বা লিভ-ইন পার্টনাররা প্রেমিক-প্রেমিকার বদলে কর্পোরেট পার্টনার বা ফ্ল্যাটমেটের মতো আচরণ শুরু করে। সম্পর্কটা টিকে থাকে শুধু লজিস্টিকসের উপর, বাজার, বিল, বাচ্চার স্কুল, শ্বশুরবাড়ির দায়িত্ব। ইমোশনাল আর ফিজিক্যাল ইন্টিমেসি শূন্যে নেমে আসে। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক রিপোর্ট বলছে, দীর্ঘদিন একসাথে থাকা কাপলদের ৪০% এই ফেজের মধ্যে দিয়ে যায়।
কেন হচ্ছে এমন? প্রথম কারণ, ‘হাসল কালচার’। তরুণ প্রজন্ম কেরিয়ার, সাইড হাসল, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে এত ব্যস্ত যে সম্পর্কে সময় দেওয়াটাকেই ‘আনপ্রোডাক্টিভ’ মনে করে। সারাদিন অফিস করে এসে দুজনেই ফোনে মুখ গুঁজে রিল দেখে। দ্বিতীয় কারণ, ‘কমফোর্ট জোন’। সম্পর্কের শুরুর দিকে যে এফোর্টটা থাকে, বিয়ে বা কমিটমেন্টের পর সেটা উধাও হয়ে যায়। “ও তো আছেই” ভেবে আমরা স্পেশাল ফিল করানো বন্ধ করে দিই। তৃতীয় কারণ, সন্তান। বাচ্চা হওয়ার পর কাপলরা ‘মা-বাবা’ হয়ে যায়, ‘স্বামী-স্ত্রী’ আর থাকে না। সব কথা বাচ্চাকে ঘিরেই হয়। চতুর্থ কারণ, ঝগড়া এড়ানো। অনেক কাপল শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে কঠিন কথাগুলো চেপে যায়। ধীরে ধীরে কমিউনিকেশন গ্যাপ এত বড় হয় যে আর কথা বলারই কিছু থাকে না।
লক্ষণগুলো কী?
ডা. বলছেন, “যদি দেখেন আপনারা শুধু ‘কী রান্না হবে’, ‘ইলেকট্রিক বিল দিয়েছো?’ এই টাইপের কথা বলেন। যদি মাসের পর মাস শারীরিক ঘনিষ্ঠতা না হয়, আর সেটা নিয়ে দুজনের কারও মাথাব্যথা না থাকে। যদি একসাথে বসে সিনেমা দেখেন কিন্তু কেউ কারও দিকে তাকান না। যদি ছুটির দিনে আলাদা আলাদা প্ল্যান করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। যদি ‘আই লাভ ইউ’ বলাটা অভ্যাসবশত হয়, ফিল করে না হয়, তাহলে বুঝবেন আপনারা ফ্ল্যাটমেট হয়ে গেছেন।”
এটা কি ডিভোর্সের দিকে নিয়ে যায়? সরাসরি না। অনেক কাপল এভাবেই ২০-৩০ বছর কাটিয়ে দেয়। কারণ ঝগড়া নেই, সুবিধা আছে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা একাকীত্ব গ্রাস করে। যে কোনো একজনের জীবনে তৃতীয় কেউ এলে এই ফাঁপা সম্পর্ক হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। APA-এর ডেটা বলছে, ইমোশনাল ডিসকানেক্টই ৭০% ডিভোর্সের মূল কারণ।
বাঁচার উপায় কী?
প্রথম, সমস্যাটা স্বীকার করুন। দুজনে বসে কথা বলুন, ব্লেম গেম না করে। “আমার মনে হচ্ছে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি” এভাবে শুরু করুন। দ্বিতীয়, ‘ডেট নাইট’ ফিরিয়ে আনুন। সপ্তাহে একদিন, ফোন ছাড়া, শুধু দুজন। রেস্তোরাঁয় না গেলেও ছাদে বসে চা খান, পুরনো অ্যালবাম দেখুন। তৃতীয়, ‘৬ সেকেন্ড কিস’ রুল। থেরাপিস্ট ড. জন গটম্যানের পরামর্শ, দিনে একবার অন্তত ৬ সেকেন্ড ধরে পার্টনারকে চুমু খান বা জড়িয়ে ধরুন। এতে অক্সিটোসিন হরমোন বেরোয়, যা বন্ডিং বাড়ায়। চতুর্থ, নতুন কিছু করুন একসাথে। একটা ক্লাস জয়েন করুন, রান্না শিখুন, ছোট ট্রিপে যান। নোভেলটি ব্রেনে ডোপামিন রিলিজ করে, যা প্রেমের শুরুর দিকের ফিলিং ফিরিয়ে আনে। পঞ্চম, ফোনের জন্য ‘নো-স্ক্রিন টাইম’ বানান। রাত ৯টা থেকে ১০টা, শুধু গল্প। শেষ উপায়, কাপল থেরাপি। কথা বলে যদি লাভ না হয়, প্রফেশনাল সাহায্য নিতে লজ্জা নেই।
অতএব, সম্পর্ক গাছের মতো। জল না দিলে, রোদ না লাগালে সে মরে যায়। EMI আর বাজার করে সংসার চলে, কিন্তু প্রেম চলে এফোর্টে। ফ্ল্যাটমেট থেকে আবার প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে উঠুন। কারণ এক ছাদের নিচে দুজন অচেনা মানুষের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে কষ্টের আর কিছু নেই।

