রুটি-তরকারি নিয়ে বন্ধুরা হাসছে? আচারের বয়াম দেখে ব্যঙ্গ করছে? মনোবিদরা বলছেন এটা "Lunchbox Shaming"। আর এর ফলে বাচ্চারা খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, ডিপ্রেশনে যাচ্ছে।
"মা, আজ টিফিন খাইনি। পেট ভরা।" রোজ স্কুল থেকে ফিরে এই একই উত্তর শুনছেন? প্রথমে ভাববেন হয়তো সত্যিই খিদে নেই। কিন্তু ২-৩ দিন পর যখন দেখবেন বাচ্চা রোগা হয়ে যাচ্ছে, স্কুলের নামে অজুহাত দিচ্ছে, তখন বুঝবেন সমস্যাটা পেটে নয়, মনে।
স্কুলে এখন একটা নতুন আর ভয়ংকর ট্রেন্ড চালু হয়েছে। নাম Lunchbox Shaming। এর মানে খুব সোজা। টিফিনবক্স খোলার সাথে সাথেই বন্ধুরা ঘিরে ধরে। কারও রুটি-আলুভাজা দেখে নাক সিঁটকায়, কারও বাড়ির বানানো আচারের বয়াম নিয়ে হাসাহাসি করে, আবার কেউ ভাত-ডাল দেখে বলে ওঠে "ছি! বাসি খাবার"। গরিব-বড়লোক, বাঙালি-অন্য রাজ্যের খাবার - সব নিয়েই এখন চলে ব্যঙ্গ।
বিশিষ্ট চাইল্ড সাইকোলজিস্টরা বলছেন, "বাবা-মায়েরা ভাবেন এটা বাচ্চাদের দুষ্টুমি। কিন্তু না, এটা পুরোপুরি মানসিক নির্যাতন। আর যে বাচ্চাটা শিকার হচ্ছে সে ধীরে ধীরে খাওয়া বন্ধ করে দেয়, ক্লাসে একা হয়ে যায়, এমনকি স্কুলেই যেতে চায় না।"
Lunchbox Shaming আসলে কী? আর হঠাৎ কেন বাড়ছে?
খাবার দিয়ে বিচার, মানুষ দিয়ে নয়। আগে স্কুলে টিফিন শেয়ার হত। "তোরটা একটু দে, আমারটা নে"। আর এখন? এখন চলে তুলনা। এর পিছনে বড় কারণ সোশ্যাল মিডিয়া। ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব শর্টসে বাচ্চারা রোজ দেখে রংবেরঙের "Aesthetic Lunchbox"। সেখানে থাকছে পাস্তা, স্যান্ডউইচ, কাপকেক, চকোলেট। তার পাশে যখন কারও মায়ের হাতের গরম পরোটা-তরকারি বা টিফিন কৌটোয় ভাত-ডাল আসে, তখনই শুরু হয় কটাক্ষ।
"তোর মা কী দিয়েছে রে?" "এই গন্ধটা কী বিচ্ছিরি" "আমার মা তো রোজ পিজ্জা দেয়" - এই কয়েকটা কথাই যথেষ্ট একটা ৮-১০ বছরের বাচ্চাকে শেষ করে দেওয়ার জন্য। মনোবিদদের মতে এর পিছনে দুটো বড় কারণ কাজ করছে। এক, বাড়িতে বড়রাই যদি অন্যের খাবার-পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ করে, তাহলে বাচ্চা সেটাই শিখবে। দুই, নিজের টিফিন ভালো না হলে অন্যেরটা ছোট করে নিজেকে বড় প্রমাণ করার Insecurity।
এর প্রভাব কতটা মারাত্মক? এই ৩টে লক্ষণ দেখলেই সাবধান
পেট নয়, মন অসুস্থ হচ্ছে। Lunchbox Shaming শুধু টিফিনের ব্যাপার নয়। এটা সরাসরি বাচ্চার মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত করে। ড. বলছেন, শিকার হওয়া বাচ্চাদের মধ্যে ৩টে কমন লক্ষণ দেখা যায়।
প্রথমত, তারা আস্তে আস্তে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। "আমার খিদে নেই" বলে টিফিন ব্যাগেই ফেরত আনে। মাস খানেকের মধ্যে ওজন কমে যায়, স্কুলে মাথা ঘোরে, ক্লাসে মন বসে না। দ্বিতীয়ত, তৈরি হয় স্কুল-আতঙ্ক। সকালে পেট ব্যথা, জ্বর, বমি। আসলে এগুলো অজুহাত। টিফিন টাইম হলেই বাথরুমে গিয়ে লুকিয়ে থাকে যাতে কেউ না দেখে। তৃতীয়ত, সবচেয়ে কষ্টের। বাচ্চা নিজের মায়ের রান্নাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। "তুমি কেন অন্য মায়েদের মতো সুন্দর টিফিন দাও না" বলে ঝগড়া করে। ভিতরে ভিতরে নিজেকে ছোট ভাবে। দীর্ঘদিন চললে এখান থেকেই Eating Disorder আর Anxiety শুরু হয়।
তাহলে উপায় কী? বাবা-মা হিসেবে আপনি কী করবেন
লজ্জা নয়, গর্ব শেখান : আতঙ্কিত হবেন না। বরং এই ৪টে স্টেপ আজ থেকেই ফলো করুন।
এক নম্বর, বাচ্চার সাথে বন্ধুর মতো কথা বলুন। "টিফিনে কী হয় রে?" জিজ্ঞেস করুন। যদি সে কাঁদে বা চুপ করে যায়, তাহলে বুঝবেন কিছু একটা হয়েছে। রাগবেন না, জোর করবেন না। ওকে ভরসা দিন যে আপনি ওর পাশে আছেন। দুই নম্বর, টিফিনকে একটা গল্প বানিয়ে দিন। "এটা ঠাকুমার স্পেশাল আলু পরোটা। এতে অনেক ভালোবাসা মেশানো আছে"। খাবারের সাথে ইমোশন জুড়ে দিলে বাচ্চা লজ্জার বদলে গর্ব করে বলবে। তিন নম্বর, প্রয়োজনে স্কুল টিচার বা প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলুন। ভালো স্কুলগুলোতে এখন "No Food Shaming" এর নিয়ম থাকে। PTM এ বিষয়টা তুলুন। আর চার নম্বর, সবচেয়ে জরুরি। বাড়িতে আমরাও যেন অন্যের খাবার, চেহারা, পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ না করি। বাচ্চা প্রথম পাঠ বাড়ি থেকেই নেয়। *
টিফিনে ভালোবাসা থাকে, লজ্জা নয়:
মনে রাখবেন, একটা ব্র্যান্ডেড স্যান্ডউইচের থেকে মায়ের হাতের গরম ভাত আর ঘি অনেক বেশি পুষ্টিকর। আপনার সন্তানকে ছোট থেকেই শেখান - "আমরা যা খাই সেটা আমাদের পরিচয়। এটা নিয়ে লজ্জা নয়, গর্ব করতে হয়।"
যদি দেখেন আপনার বাচ্চা রোজ টিফিন ফেরত আনছে, চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে, স্কুল যেতে চাইছে না, তাহলে এটাকে "ছোট ব্যাপার" ভেবে উড়িয়ে দেবেন না। এটা ওর মনের কান্না। সময় থাকতে পাশে দাঁড়ান।


