ভিড় এড়িয়ে পাহাড়ে ২ দিন কাটাতে চান? কালিম্পং-এর শেষ গ্রাম পালাতোদে হতে পারে আপনার জন্য পারফেক্ট। হোমস্টের বারান্দা থেকেই দেখা যায় ভুটানের পাহাড়, চারদিকে শুধু এলাচের গন্ধ আর নিস্তব্ধতা।
শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন, অফিসের ডেডলাইন আর সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন? মনে হচ্ছে দুটো দিন সবকিছু ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গেলে ভালো হতো, যেখানে সকালে ঘুম ভাঙবে পাখির ডাকে, জানলা খুললেই দেখা যাবে মেঘে ঢাকা পাহাড় আর রাতে আকাশ ভরা তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়বেন? যদি এমন কোনও নিরিবিলি, অফবিট জায়গা খুঁজে থাকেন, তাহলে এবার ব্যাগ গুছিয়ে নিন পালাতোদের জন্য। এই গ্রামটা এখনও সেভাবে পর্যটনের মানচিত্রে আসেনি, তাই এর সৌন্দর্য একেবারে অকৃত্রিম।
উত্তরবঙ্গের কালিম্পং জেলার একদম শেষ প্রান্তে, ভুটান সীমান্তের গায়ে লেগে থাকা এক ছবির মতো সুন্দর গ্রাম হল পালাতোদে, যাকে স্থানীয়রা ভালোবেসে বলে টোডে-তাংতা। এটি ভারতের শেষ গ্রামগুলির মধ্যে একটি, এর পরেই শুরু হচ্ছে ভুটান। উচ্চতা প্রায় ৪০০০ ফুটের বেশি হওয়ায় এখানে সারাবছরই একটা ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ থাকে। এখানে বড় হোটেল নেই, রিসর্টের ভিড় নেই, আছে শুধু মেঘ, পাহাড়, গভীর জঙ্গল আর পাহাড়ি মানুষের সহজ সরল হাসি। একবার এলে আপনার মনে হবে, সময় যেন এখানে থমকে আছে।
কেন যাবেন পালাতোদে? হোমস্টে থেকেই দেখুন ভুটান:
এই গ্রামের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এর অবিশ্বাস্য ভিউ। এখানে আপনি হোমস্টেতে বসেই ভুটানের পাহাড় দেখতে পারবেন, যা আপনার মন জুড়িয়ে দিতে বাধ্য। হোমস্টের কাঠের বারান্দায় বসে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে সামনে দেখবেন ভুটানের পশ্চিম অংশের বিস্তীর্ণ পাহাড়শ্রেণী, নাথুলা এবং ডোকলাম রেঞ্জের প্যানোরামিক ভিউ একেবারে পরিষ্কার দেখা যায়। ভোরবেলা যখন হালকা কুয়াশা সরতে থাকে এবং সূর্যের প্রথম আলো ভুটানের পাহাড়ে এসে পড়ে, তখন যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। আপনার চোখ ধাঁধিয়ে যেতে বাধ্য।
এই জায়গাটি বিখ্যাত বড় কালো এলাচের চাষের জন্য। যতদূর চোখ যায়, শুধু এলাচের ক্ষেত আর ঘন জঙ্গল। বাতাসে সবসময় একটা মিষ্টি এলাচের গন্ধ ভেসে বেড়ায়। এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্ক প্রায় নেই বললেই চলে, কোনও কোনও জায়গায় Jio-র টাওয়ার সামান্য পাওয়া যায়। তাই আপনি সত্যিই ডিজিটাল ডিটক্স করতে পারবেন, পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটাতে পারবেন, যা শহরে বসে আমরা ভুলেই গেছি।
কী কী করবেন? এখানে সময় কাটানোর অনেক উপায় আছে
১. রিভার ক্যাম্পিং ও হাইকিং: গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ডায়না নদীর ধারে ক্যাম্পিং করতে পারেন। নদীর জল একেবারে স্বচ্ছ, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলেছে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছোট ছোট ট্রেক রুট আছে, যা আপনাকে নিয়ে যাবে আরও গভীর প্রকৃতির মধ্যে। চাইলে স্থানীয় গাইড নিয়ে ছোট ট্রেক করে আসতে পারেন। ২. বার্ড ওয়াচিং ও প্রকৃতি: এটি পাখি প্রেমীদের জন্য এক টুকরো স্বর্গ। এখানে বহু বিরল প্রজাতির হিমালয়ান পাখি দেখা যায়। সকালে ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই মন ভালো হয়ে যাবে। ৩. অর্গানিক খাবার ও বনফায়ার: হোমস্টেগুলিতে সম্পূর্ণ ঘরোয়া, অর্গানিক খাবার পরিবেশন করা হয়। নিজেদের ক্ষেতের শাকসবজি, ডাল, ডিম আর লোকাল মুরগির ঝোল - স্বাদ একবার খেলে ভুলবেন না। সন্ধ্যায় ঠান্ডার মধ্যে রাতে বনফায়ার আর বারবিকিউ-এর ব্যবস্থাও আছে, যেখানে হোমস্টের মালিকরা আপনাকে স্থানীয় গল্প শোনাবেন।
কীভাবে যাবেন? থাকবেন কোথায়, খরচ কত?
শিয়ালদহ বা হাওড়া থেকে ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) বা মালবাজার স্টেশনে নামতে হবে। NJP থেকে দূরত্ব প্রায় ১১৩ কিমি, মালবাজার থেকে ৫৭ কিমি। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে লাটাগুড়ি, চালসা, ঝালং, বিন্দু হয়ে পৌঁছে যাবেন টোডে। রাস্তার শেষ ১০-১২ কিমি একটু অফরোড এবং জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, কিন্তু সেই জঙ্গল সাফারির অভিজ্ঞতাই আপনার যাত্রাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তুলবে। নিকটতম বিমানবন্দর বাগডোগরা, প্রায় ১২৫ কিমি দূরে।
এখানে থাকার জন্য সেরা এবং একমাত্র অপশন হল হোমস্টে। যেমন কার্ডামম হোমস্টে (Cardamom Homestay) খুবই জনপ্রিয়। প্রতিটি হোমস্টেতে অ্যাটাচড বাথরুম, গরম জল, ফ্রি পার্কিং-এর সুবিধা আছে। আতিথেয়তা এতটাই ভালো যে মনে হবে নিজের বাড়িতেই আছেন। থাকা-খাওয়া নিয়ে মাথাপিছু খরচ পড়বে দিনে ১৫০০-১৮০০ টাকার মতো। ২ রাত ৩ দিনের জন্য ২ জনের বাজেট ১০-১২ হাজার টাকাই যথেষ্ট, যার মধ্যে NJP থেকে গাড়ি ভাড়াও ধরা যায়।
যদি সত্যিই ভিড় থেকে দূরে, পাহাড়ের কোলে ২টো দিন নিজের মতো করে, নিরিবিলিতে কাটাতে চান এবং বারান্দায় বসে ভুটানের পাহাড় দেখতে চান, তাহলে পালাতোদে আপনাকে নিরাশ করবে না। এটি সত্যিই এক টুকরো স্বর্গ।


