খাবার বাঁচাতে গিয়ে শরীরের বারোটা বাজাচ্ছেন না তো? কখন ফ্রিজে রাখবেন আর কীভাবে গরম করবেন— জেনে নিন বাসি খাবার নিরাপদে খাওয়ার সেই বৈজ্ঞানিক নিয়ম!

"কাল রাতের তরকারিটা তো নষ্ট হয়নি, একটু গরম করে নিলেই হবে!"— বাঙালির রান্নাঘরে এই সংলাপ অত্যন্ত পরিচিত। খাবার অপচয় না করার এই মানসিকতা ইতিবাচক হলেও, এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পুষ্টিবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বাহ্যিক রূপ, গন্ধ বা স্বাদে কোনো পরিবর্তন না এলেও বাসি খাবারে এমন কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও টক্সিন (বিষাক্ত উপাদান) জন্মায়, যা খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। আর এই বাসি খাবার থেকেই ছড়াচ্ছে বমি, ডায়রিয়া, পেটের তীব্র যন্ত্রণা এবং ফুড পয়জনিংয়ের মতো জটিল রোগ।

Add Asianetnews Bangla as a Preferred SourcegooglePreferred

খাদ্যবিজ্ঞানীদের মতে, রান্না করার পর খাবার যখন ৫ ডিগ্রি থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে থাকে, তখন সেই অবস্থাকে ব্যাকটেরিয়ার "Danger Zone" বা বিপজ্জনক স্তর বলা হয়। এই তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া প্রতি ২০ মিনিটে দ্বিগুণ হারে বংশবৃদ্ধি করে। রান্না করা গরম তরকারি সাধারণ তাপমাত্রায় মাত্র ২ ঘণ্টার বেশি বাইরে ফেলে রাখলেই এই ঝুঁকি তৈরি হয়।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হলো ভাত ও নুডলসের ক্ষেত্রে। এতে Bacillus cereus নামের এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া জন্মায়। পুষ্টিবিদদের মতে, এই ব্যাকটেরিয়াটি এমন এক টক্সিন তৈরি করে, যা উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে গরম করলেও নষ্ট হয় না। ফলে বাসি ভাত খেয়ে আকস্মিক পেটে ব্যথা ও বমির ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে।

চিকিৎসকদের মতে, বাসি খাবার মানেই তা ফেলে দিতে হবে এমন নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ রোধ করা সম্ভব।

স্বর্ণালী নিয়ম: রান্না শেষ হওয়ার ২ ঘণ্টার মধ্যে খাবার ফ্রিজে তুলতে হবে। তবে গ্রীষ্মকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় এই সময়সীমা ১ ঘণ্টা। ফ্রিজের তাপমাত্রা সর্বদা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকা জরুরি।

খাবারের ধরন অনুযায়ী ফ্রিজে রাখার নিরাপদ সময়সীমাগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ভাত ও নুডলস: ফ্রিজে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা রাখা যেতে পারে। তবে এটি একবারের বেশি গরম করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ডাল ও সবজি: ২ থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যায়, তবে খাওয়ার আগে অবশ্যই খুব ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে।

মাছ, মাংস ও ডিম: সর্বোচ্চ ২ দিন রাখা নিরাপদ। এর বেশি রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি তীব্র হয়।

দুধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী: এগুলো ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে দ্রুত ব্যবহার করে ফেলা শ্রেয়।

তেলেভাজা বা শুকনো খাবার: ২৪ ঘণ্টার পর বা ১ দিনের বেশি না রাখাই ভালো।

পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, অনেক সময় খাবারের গন্ধ ঠিক থাকলেও তা বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে। তাই খাওয়ার আগে নিচের লক্ষণগুলো যাচাই করে নেওয়া জরুরি:

১. ভাতের ওপর সাদা আস্তরণ বা সুতোর মতো অংশ দেখা যাওয়া।

২. তরকারি স্পর্শ করলে চটচটে বা পিচ্ছিল বোধ হওয়া।

৩. তরকারির ঝোলে বুদবুদ বা ফেনা ওঠা।

৪. মুখে দেওয়ার পর সামান্য টক বা অস্বাভাবিক স্বাদ লাগা।

ক্রস কন্টামিনেশন এড়াতে করণীয়: ফ্রিজে কাঁচা মাছ-মাংসের ঠিক পাশে কখনোই রান্না করা খাবার রাখা যাবে না। এতে কাঁচা মাংসের ব্যাকটেরিয়া রান্না করা খাবারে ছড়িয়ে পড়ে (Cross Contamination)। এছাড়াও খাবার বড় পাত্রে না রেখে ছোট ছোট বাটিতে ভাগ করে রাখলে তা দ্রুত ঠান্ডা হয়।

বিশেষ করে আমাদের দেশের এই গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত ছড়ায়। তাই সামান্য সন্দেহের অবকাশ থাকলে সেই বাসি খাবার বর্ষণ করাই শ্রেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে—"হাসপাতালের মোটা অঙ্কের বিল বা শারীরিক কষ্টের তুলনায় সামান্য কিছু টাকার খাবার ফেলে দেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।"

ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে সামান্য উষ্ণ বা হালকা গরম করে খাওয়ার অভ্যাস অত্যন্ত বিপজ্জনক। খাবার এমনভাবে গরম করতে হবে যেন তার কেন্দ্র বা ভেতর পর্যন্ত তাপমাত্রা অন্তত ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়।

গ্যাসে গরম করার ক্ষেত্রে: পাত্রটি ঢাকা দিয়ে ঝোল বা তরকারি ভালো করে ফুটিয়ে নিতে হবে।

মাইক্রোওভেনের ক্ষেত্রে: গরম করার মাঝে মাঝে খাবারটি ভালো করে নেড়ে দিতে হবে, যাতে সব অংশে সমান তাপ পৌঁছায়।

বারবার গরম করার নিষেধাজ্ঞা: একটি খাবার বারবার ফ্রিজ থেকে বের করা এবং গরম করা উচিত নয়। তাপমাত্রার এই ঘনঘন ওঠানামায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।