ব্রজভূমিতে দোল একদিনের নয়, বসন্ত পঞ্চমী থেকে ধুলেণ্ডি পর্যন্তয় প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা ভক্তি ও রঙের উৎসব। শ্রীকৃষ্ণের লীলাকে ঘিরে লঠমার, ফুলের ও ছড়ি মার হোলির মাধ্যমে ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির অনন্য রূপ ফুটে
দেশের অধিকাংশ জায়গায় দোল বা হোলি মানে একদিনের রঙের উৎসব। কিন্তু উত্তর ভারতের ব্রজভূমিতে এই উৎসবের সময়সীমা ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকে না। এখানে দোল মানে প্রায় দেড় মাস ধরে চলা এক ধারাবাহিক আনন্দযাপন, যার শুরু বসন্ত পঞ্চমী থেকে এবং শেষ হয় ধুলেণ্ডির দিনে। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা এই দোলযাত্রা শুধু উৎসব নয়, ব্রজবাসীদের জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ব্রজ অঞ্চলের মানুষ বিশ্বাস করেন, বসন্তের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর লীলা শুরু করেছিলেন। রাধা ও গোপিনীদের সঙ্গে রঙের খেলায় মেতেছিলেন তিনি বহু আগেই, নির্দিষ্ট হোলির দিনের অপেক্ষা না করেই। সেই বিশ্বাস থেকেই বসন্ত পঞ্চমীর দিন ব্রজের বিভিন্ন মন্দিরে দেবতার গায়ে আবির দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয় বিশেষ ভক্তিগীতি—‘হোলি রসিয়া’।
প্রতিদিন এই গান, আবির ও পূজার মধ্য দিয়ে ভক্তরা যেন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে এক নীরব কথোপকথনে অংশ নেন। এই দীর্ঘ উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় প্রতীকী আচার দিয়ে। বসন্ত পঞ্চমীর দিন ব্রজের নানা গ্রাম ও পাড়ায় দোল উপলক্ষে বাঁশ পোঁতা হয়, যা আসলে আসন্ন রঙের উৎসবের ঘোষণা। শীত বিদায় নিয়ে বসন্ত যত এগিয়ে আসে, প্রকৃতির বদলের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবও ধীরে ধীরে গতি পায়। মাঠে-ঘাটে, মন্দির প্রাঙ্গণে, গলিপথে ছড়িয়ে পড়ে গান, নাচ আর রঙের আবহ। ব্রজের দোলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক তার বহুরূপতা। এখানে একেক গ্রামে একেক রকম দোল খেলার চল আছে। বারসানা ও নন্দগাঁওয়ে পালিত হয় বহুল পরিচিত লঠমার হোলি, যেখানে নারীরা প্রতীকীভাবে পুরুষদের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন, আর সেই দৃশ্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করেন। বৃন্দাবনে দোলের রূপ অনেকটাই ভক্তিময়—এখানে আবিরের বদলে দেবতার উদ্দেশে ছোড়া হয় রঙিন ফুল, যা ‘ফুলের হোলি’ নামে পরিচিত। আবার গোকুল অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে ছড়ি মার হোলি, যা স্থানীয় লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। শহরের হোলির সঙ্গে তুলনা করলে ব্রজের দোল অনেক বেশি সংযত ও আচারনির্ভর। এখানে রঙের উন্মাদনা থাকলেও তার কেন্দ্রে থাকে ভক্তি ও ঐতিহ্য।
মন্দিরভিত্তিক এই উৎসব ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতিরও বার্তা দেয়। জাত-ধর্ম-বয়সের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একসঙ্গে এই দীর্ঘ উৎসবে শামিল হন। এই কারণেই ব্রজের দোলকে একদিনের উৎসব হিসেবে দেখা যায় না। বসন্তের আগমন থেকে শুরু করে প্রকৃতির পূর্ণ বিকাশ পর্যন্ত, প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা এই দোলযাত্রা ব্রজভূমিকে রঙ, বিশ্বাস ও মিলনের এক অনন্য ভূমিতে পরিণত করে—যা ভারতের উৎসব সংস্কৃতিতে একেবারেই আলাদা মাত্রা যোগ করে।
