নির্বাসনের কুড়ি। কুড়ির নির্বাসনের ইন্ধন জোগাল নতুন কলকাতা রবীন্দ্র সদন পয়লা অগাস্ট দু হাজার ছাব্বিশ। আমি ভাবতেও পারিনি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয় এই নির্বাসন এত সহজে ভেঙে দেবেন। আমি আপনাকে কুর্নিশ জানাই মাননীয়। এটা কোনও তাঁবেদারির সৌজন্য নয়, এটা একজন লেখক, কবির ভিতরের আত্মপলব্ধি।
নির্বাসনের কুড়ি। কুড়ির নির্বাসনের ইন্ধন জোগাল নতুন কলকাতা রবীন্দ্র সদন পয়লা অগাস্ট দু হাজার ছাব্বিশ। আমি ভাবতেও পারিনি মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয় এই নির্বাসন এত সহজে ভেঙে দেবেন। আমি আপনাকে কুর্নিশ জানাই মাননীয়। এটা কোনও তাঁবেদারির সৌজন্য নয়, এটা একজন লেখক, কবির ভিতরের আত্মপলব্ধি। নির্বাসন যদি একজন লেখক কে সত্যি বলার জন্য দেয়া হয় তবে সেই নির্বাসন রাষ্ট্রের, ভাষার ও স্বাধীনতার'ও।। তসলিমা নাসরিন শুধুই একজন বিদ্রোহী লেখিকা নন তিনি একজন সর্বহারা লেখকের জীবন। রামের বনবাস চোদ্দ বছরে মিটলেও একজন কবির নির্বাসন কলকাতায় মিটতে প্রায় কুড়ি বছরের পার। তাঁর দেশের নির্বাসন প্রায় বত্রিশ বছরের কাঠগোড়ায়। তিনি কোনও খুন করেননি কারও ঘর পোড়াননি। সরকারি নথি পাচার করেননি। তিনি মৌলবাদের বিরুদ্ধে সঠিক কথা বলেছিলেন মাত্র।
কলকাতা সেই বিদ্রোহী কবিকে নিজের ঘর দিয়েছিল। এখানেও বাধ সাধল রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ। তাঁকে এইটুকুও হারাতে হল। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সরকার এই কলঙ্কিত ঘটনার যুক্তি দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার তাঁকে ফিরিয়ে নতুন এক যুক্তির দিক নির্ধারণ করলেন। তিনি প্রমাণ করলেন কোনও অবস্থাতেই শিল্পীর স্বাধীনতা যেন অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়। মাননীয় মুখমন্ত্রী শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয় "শার্লি এবদো" এর নতুন সংস্করন করলেন এই নতুন কলকাতায়।
কলকাতা ওস্তাদের শহর, প্রাণশক্তির কেন্দ্র, সঞ্জীবনি সুধা।
কিন্তু এই তসলিমার "ফেরা " আমাকে "লজ্জা " দিয়েছে গতকাল। আমি এমন ভাবে লজ্জিত হয়নি বহুকাল।। একজন লেখিকার নির্বাসন ভাঙার মঞ্চে আর একজন কবি কে "নির্বাসিত " হতে হল। এটা কি লজ্জার নয়? একজন কবি কি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করেন আমি জানতে চাই না। কিন্তু আমি জানি তিনি আমার মতোন বহু তরুণ কে প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক। একজন নিঃস্ব সেলাই দিদিমনির গল্প হয়ে উঠতে পেরেছেন। তিনি আজও আমার কাছে "বিকেলবেলার কবিতা ও ঘাস ফুলের কবি "। তাঁর লেখাকে আমি সম্মান করি। আমার কাছে তাঁর পরিচয় একজন কবি ছাড়া আর কিছু নয়।
আমার নতুন কলকাতায় রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ ঘটছে না তো? নতুন কলকাতা শিল্প, সাহিত্য, নাটক, সিনেমাতে রাজনৈতিক সমীকরন আনার চেষ্টায় নেই তো? আমার কলকাতা গিটার আর স্বাধীন কথা বলার দেশ। আমি সেটুকু আজ অবধি জেনে এসেছি। আমার এই রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ নিয়ে জিজ্ঞাসা নিজের কাছে এবং আপামর কলকাতাবাসীর কাছে!!
গতকালের ভিড় থেকে নির্দিষ্ট কিছু মানুষজন যেভাবে তসলিমার আহ্বান সত্ত্বেও মঞ্চ আর একজন কবিকে নেমে যেতে বাধ্য করল,সেটা আমার কাছে তীব্র লজ্জার। ও ঘৃণার। এটা তসলিমার কাছেও লজ্জার। একজন কবির ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থাকতে পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই অবশেষ যেন সমালোচনায় থাকে, যুক্তি তর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই কলকাতা আমার দেশ না।।
তসলিমা অনুভবি। তিনি গতকাল বক্তব্য মঞ্চে রাখার আগে স্বচক্ষে দেখলেন কীভাবে অশিক্ষিত রাজনৈতিক সমীকরণে বিভাজিত সমাজ যুগে যুগে তাঁর নির্বাসনকে বাঁচিয়ে রাখছে। তাঁর এই নির্বাসন কোথাও কালান্তরে পরিণত হচ্ছে। আমাকে মনে করিয়ে দিল রাজশেখর বসুর কিছু লেখার বিষয়বস্তু। একসময় কলকাতা কে প্যারিসের সঙ্গে তুলনা করা হত। আজ রাজনৈতিক রঙের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাহলে কি নতুন কলকাতায় রাজনৈতিক অনুপ্রেরণাকারীদের প্রবেশ ঘটছে? তাহলে কি শিল্প, খেলা, ক্রিয়েটিভ ক্ষেত্রগুলো আগের মতোই একই গতে অনুধাবিত হবে? জানা নেই।
শঙ্খ ঘোষ বেঁচে থাকলে নিশ্চয় তিনি লিখতেন। সত্যজিৎ আবারও একটা "গণশত্রু " বানাতেন। আশা করি গতকাল তসলিমা এটা বুঝেছেন নাগরিক সমাজ কোনওদিন কোনও স্বতন্ত্র কবিকে জায়গা দেয় না। দেয়নি। পুরো সমাজটাই তাঁর কাছে আজও জেলখানার সমান। কোথাও এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো যাচ্ছে না। কবিরা এই পরীক্ষায় শূন্য পেয়েছেন। তাঁদের রক্তগ্ৰুপ কালচারেও স্পষ্ট করা যাচ্ছে না।
এভাবেই যুগে যুগে অবোধ কিছু রাজনৈতিক মানুষ কবিদের নিঃস্বার্থ নির্বাসন দিয়েছেন। তাঁদের ফেরাতে আবার হাততালিও দিয়েছেন। অথচ এই যুগে যুগে অপমানিত কবিরা আমাদের জন্যই আঁচল ভরে ভালোবাসা তুলে আনেন। শব্দের গাছে ইচ্ছার ফুল ফোটান। তাঁর হৃদি অলকানন্দা জলে ভেসে আজও যাবে কিনা জানা নেই। তবে কবি আজ অনুভব করছেন এই জলের স্বাদ নোনতা, খাড়া পানি। এই জল পানীয় জল হলেও পরিশোধিত নয়। তাই জন্যই হয়ত লিখেছিলাম আর ইমন সেন গেয়েছিল " সাহস কখনও তুচ্ছ হতে চায় না/ একলা মরার স্বাধীনতা বিপ্লব দেয় না।"
বিঃদ্রঃ যেদিন তসলিমার আসার খবরে মুহূ মুহূ খবর হবে না সেদিন বোধয় তাঁর নির্বাসন সত্যই কাটবে। শেষাংশে মনে হল বিপ্লবী পুলীনবিহারি দাস বেঁচে থাকলে বলতেন " বাঙালির এসব ছাড়াও দেশের জন্য অনেক কিছু করিবার আছে। সে সব দিকে তাহাদিগদের মনোনিবেশ করা উচিত ।"
অভিজিৎ পাল (ফিল্ম মেকার, কলামিস্ট)
(এটি একটি মতামতধর্মী প্রতিবেদন। এখানে মন্তব্য ও মতামতের সম্পূর্ণ দায় লেখকের)
