২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রাজ্যে এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকট তৈরি করেছে। এর নেপথ্যে কি কোনো আন্তর্জাতিক শক্তির হাত রয়েছে? জেনে নিন বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও, পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলাফল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তিনি পদত্যাগ না করে দাবি করেছেন যে, এই রায় জনগণের নয়, বরং এটি একটি ‘সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’। তাঁর মতে, লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে ছিল না, ছিল সরাসরি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, যারা তাঁর দাবি অনুযায়ী বিজেপিকে জেতাতে কাজ করেছে।
কলকাতায় সম্ভাব্য রোড শো ও অনুপ্রবেশকারী তত্ত্ব:
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নজিরবিহীন প্রতিরোধের পরিকল্পনা করছেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কলকাতায় একটি বিশাল রোড শো-এর আয়োজন করা হতে পারে। অভিযোগ উঠছে যে, নির্বাচনে যে ২৭ লক্ষ ভোটারকে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল (যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু ও অনুপ্রবেশকারী বলে দাবি করা হচ্ছে), তাঁদের এই মিছিলে সামিল করে জনশক্তির প্রদর্শন করা হতে পারে। এই মিছিলে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যিনি ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। অখিলেশ ছাড়াও আরও বড় আঞ্চলিক দলের মাথারাও থাকতে পারে এই মিছিলে। এই মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজভবনে না যাওয়ার এবং রাজ্যপালকে অস্বীকার করার চরম ঘোষণা করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ও ‘ডিপ স্টেট’ ফ্যাক্টর:
উৎসগুলোতে বারবার ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান ‘ডিপ স্টেট’ বা CIA-এর হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক অর্ণব গোস্বামী দাবি করেছেন যে, ভারতের বর্তমান সরকারকে অস্থিতিশীল করতে মার্কিন সংস্থাগুলো সক্রিয় এবং তারা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যেভাবে সেখানে ‘পুতুল সরকার’ বসানো হয়েছে, সেই একই মডেল ভারতে প্রয়োগ করার চেষ্টা চলছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের খবর, এই ষড়যন্ত্রের মূলে থাকতে পারে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ এবং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা, যা সফল করতে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পরিবর্তনকে রোখা জরুরি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যেমন ওয়াশিংটন পোস্ট (যাকে CIA-এর মুখপত্র বলা হয়) এবং আল-জাজিরা এই পালাবদল নিয়ে যে অতি-সক্রিয়তা দেখাচ্ছে, তা এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকেই জোরালো করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর খবর অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে অভিযান চালিয়ে মোট ৮ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৬ জনকে তামিলনাড়ুর তিরুপুর থেকে এবং ২ জনকে পশ্চিমবঙ্গ (মালদহ ও মুর্শিদাবাদ) থেকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশের স্পেশ্যাল সেল। পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (ISI) এবং বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে নাশকতার পরিকল্পনা। ধৃতদের দিল্লি ও কলকাতায় 'ফ্রি কাশ্মীর' পোস্টার লাগানো এবং মেট্রো স্টেশনে হামলার ছকের সাথে যুক্ত থাকার সন্দেহ করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে দিল্লির লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণকাণ্ডে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকেছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
অর্থায়ন ও ‘ঘোড়া কেনাবেচা’র আশঙ্কা:
যদি রাজ্যপাল সংখ্যা গরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য সময় দেন, তবে সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে বিজয়ী বিধায়কদের ভাঙ্গিয়ে নেওয়ার (Horse-trading) জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, এই অর্থে বাংলাদেশের জামাত, পাকিস্তানের ISI, এবং এমনকি আনসারুল্লা বাংলা-র মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের বিনিয়োগ থাকতে পারে। উল্লেখ্য যে, অতীতেও CIA-এর বিরুদ্ধে ভারতের নীতি নির্ধারণী কাঠামোয় অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছিল।
বিরোধী জোটের ন্যারেটিভ:
তৃণমূলের এই ‘ভোট চুরি’র দাবিকে সমর্থন জানাতে শুরু করেছে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) ব্লকের অন্যান্য শরিকরাও। অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং রাহুল গান্ধী ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। রাহুল গান্ধী, যাঁকে ‘প্রিন্স পাপ্পু’ বলে কটাক্ষ করা হয়, তিনি নির্বাচনের আগে আক্রমণাত্মক থাকলেও এখন সুর বদলে ‘ভোট কারচুপি’র ন্যারেটিভ প্রচার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি:
বর্তমান বিধানসভার মেয়াদ ৭ মে পর্যন্ত। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করেন, তবে রাজ্যপাল তাঁকে বরখাস্ত করতে পারেন অথবা রাজ্যে ৩৫৬ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সুপারিশ করতে পারেন। আগামী ২-৩ দিন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।

