লেখক ও সমাজকর্মী তসলিমা নাসরিন ২০ বছর পর কলকাতায় ফিরছেন। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই, ২০২৬) তিনি তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন যে, ১ আগস্ট শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিতে যাচ্ছেন।
আমাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে ‘সেকুলার মিশন’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির কর্ণধার একজন প্রগতিশীল মুসলমান—ওসমান গণি মল্লিক। আমাকে কি বিজেপি কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছে? না। আমাকে কি পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিয়ে যাচ্ছে? না। সরকার শুধু আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছে। আমি যে রাজ্যেই যাই, সেখানে যে রাজনৈতিক দলেরই সরকার থাকুক না কেন, সেই সরকারই আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এটাই স্বাভাবিক প্রশাসনিক দায়িত্ব।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কিছু বাম নেতা আমাকে দোষ দিচ্ছেন—আমি কেন কলকাতায় যাচ্ছি! তাঁরা আমাকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছিলেন; এখন আমি সেই রাজ্যে পা রাখলেই নাকি হিন্দুত্ববাদী হয়ে যাব, বিজেপি-আরএসএস হয়ে যাব! আমি সিপিআইএম সরকারের আমন্ত্রণে বহুবার কেরালায় গিয়েছি। সেখানকার বাম নেতারা আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছেন, সম্মান জানিয়েছেন, আমার জন্য জেড প্লাস নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন। তখন কলকাতার এই বাম নেতারা কি আমাকে ‘বামপন্থী’ বলে গালি দিয়েছিলেন, নাকি আনন্দে চুমু খেয়েছিলেন? তখন তো তাঁরা দিব্যি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। আমার বেলায় তাঁদের চোখ কখনও খোলে কি?
আমার কলকাতায় যাওয়া নিয়ে এই মিথ্যা প্রচার কেন? ১৮ বছর ৮ মাস ১০ দিন পর মাত্র দু’দিনের জন্য কলকাতায় যাচ্ছি—তাতেই তাঁদের গায়ে জ্বালা ধরছে! বামফ্রন্ট সরকার আমাকে কলকাতা থেকে তাড়িয়েছিল। পরবর্তী তৃণমূল সরকারও আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেয়নি। শুধু তা-ই নয়, আমার লেখা মেগাসিরিয়ালের টেলিভিশন সম্প্রচার বন্ধ করেছে, আমার বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠান বাতিল করেছে। তখন বাংলার তথাকথিত প্রগতিশীলেরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে একটি শব্দও খরচ করেছিলেন? করেননি।
আসলে আমরা যারা মুসলিম সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনতে চাই, মুসলিমদের শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক করতে চাই, ধর্মান্ধতা, অজ্ঞতা ও বর্বরতা থেকে মুক্ত করতে চাই, নারীর সমানাধিকার ও মানবাধিকার চাই, বৈষম্যমূলক ইসলামী আইনের বদলে সমানাধিকারের ভিত্তিতে প্রণীত আধুনিক আইন প্রতিষ্ঠা করতে চাই—বাম নেতাদের অনেকেই তা সহ্য করতে পারেন না।
তাঁরা চান মুসলিম সমাজ চোদ্দশো বছর আগের নারীবিদ্বেষী, ধর্মান্ধ ও অসহিষ্ণু সমাজ হিসেবেই পড়ে থাকুক। মুসলিম সমাজের সংস্কার যাঁরা চান, তাঁদের তাঁরা শত্রু মনে করেন; এবং আমরা সকলেই জানি ধর্মীয় মৌলবাদীদের তুষ্ট করতে তাঁদের কোনও দ্বিধা নেই। এই কারণেই আমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরা নিয়ে তাঁদের এত রাগ, এত ক্ষোভ, এত মিথ্যে প্রচার। এই বামরা কি কোনও দিন মানুষ হবেন না? আর কত দিন তাঁরা প্রগতিশীলতার মুখোশ পরে জিহাদিদের ভাষায় কথা বলে যাবেন?
(এই লেখাটি তসলিমা নাসরিন ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। সেটাই তুলে দেওয়া হয়েছে়।)
