জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনের জেরে উত্তরাখণ্ডের হিমবাহগুলি দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় মধ্য হিমালয়ের ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহ ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ২৫.৬ কিলোমিটার পিছিয়ে গিয়েছে। নতুন একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনের জেরে উত্তরাখণ্ডের হিমবাহগুলি দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয় মধ্য হিমালয়ের ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহ ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ২৫.৬ কিলোমিটার পিছিয়ে গিয়েছে। নতুন একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। দেরাদুনের UPES এবং ওয়াডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজির গবেষকদের এই পর্যালোচনা ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ‘Discover Geoscience’-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা, মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা, স্যাটেলাইট ছবি, ডিজিটাল এলিভেশন মডেল (DEM) এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ হিমবাহের সম্মিলিত পশ্চাদপসরণ বা cumulative recession-এর পরিমাণ ২৫,৬২১.০১ মিটার, অর্থাৎ প্রায় ২৫.৬ কিলোমিটার। গবেষণার একটি অংশে হিমবাহগুলির গড় পিছিয়ে যাওয়ার হার বছরে ২৩.২৩ মিটার বলা হয়েছে। তবে পরে দেওয়া সারাংশের টেবিলে arithmetic mean হিসেবে বছরে ২৪.৬৩ মিটার হার উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ গড় পশ্চাদপসরণের হার নিয়ে গবেষণার মধ্যেই কিছুটা অসঙ্গতি রয়েছে।
সবচেয়ে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে কোন হিমবাহ?
উত্তরাখণ্ডের টেহরি গড়ওয়ালের খাতলিং হিমবাহ দ্রুত পিছিয়ে যাওয়া হিমবাহগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৬৫ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এই হিমবাহের পিছিয়ে যাওয়ার গড় হার ছিল বছরে প্রায় ৮৮ মিটার। ওই সময়ে হিমবাহটি প্রায় ৪.৩৪ কিলোমিটার পিছিয়ে যায়। এর ফলে হিমবাহটি ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া পিণ্ডারি হিমবাহ ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বছরে ৪৫.৮ মিটার, মিলাম হিমবাহ ১৯৭২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বছরে ৩৭.৮ মিটার এবং গঙ্গোত্রী হিমবাহ ১৯৩৫ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ২২ মিটার পিছিয়েছে।
চোরাবাড়ি হিমবাহের পিছিয়ে যাওয়ার হার ছিল বছরে ৬.৮ মিটার এবং ভাগীরথী হিমবাহের ক্ষেত্রে তা ছিল বছরে ৩.৭ মিটার। সাতোপন্থ হিমবাহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন হার পাওয়া গিয়েছে। পর্যালোচনার টেবিল অনুযায়ী, ১৯৬২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এর পিছিয়ে যাওয়ার হার ছিল বছরে ৬.৫ মিটার।
শুধু তাপমাত্রাই দায়ী নয়
গবেষণা বলছে, হিমবাহ কত দ্রুত পিছিয়ে যাবে, তা শুধু তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে না। হিমবাহের উপর জমে থাকা পাথর ও অন্যান্য আবর্জনা বা ‘সুপ্রাগ্লেশিয়াল ডেব্রি’ অনেক ক্ষেত্রে ইনসুলেশনের মতো কাজ করে। এর ফলে বরফের উপরিভাগের গলন কিছুটা ধীর হতে পারে। এই কারণেই পাথরের আবর্জনায় ঢাকা হিমবাহগুলির সামনের অংশ বা frontal retreat সাধারণত পরিষ্কার বরফের হিমবাহের তুলনায় ধীর হয়। হিমবাহের উচ্চতা, ঢাল, আয়তন এবং কোন দিকে তার মুখ রয়েছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দক্ষিণমুখী হিমবাহগুলির ক্ষেত্রে প্রায় ১৮ শতাংশ সংকোচনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মিলাম হিমবাহে তৈরি হয়েছে বহু হিমবাহ-হ্রদ
মিলাম হিমবাহে ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪৮০ মিটার পশ্চাদপসরণ লক্ষ্য করা হয়েছে। এই হিমবাহের সামনে প্রায় ৪৭টি হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হওয়ার কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, হ্রদের সঙ্গে যুক্ত হিমবাহগুলির গড় পিছিয়ে যাওয়ার হার ছিল বছরে প্রায় ৩৪.৯ মিটার। অন্যদিকে, স্থলভাগে শেষ হওয়া হিমবাহগুলির ক্ষেত্রে এই হার ছিল বছরে প্রায় ২২.৫ মিটার। হিমবাহ-হ্রদের ক্ষেত্রে বরফ ভেঙে পড়া বা calving এবং বরফের সঙ্গে জলের মিথস্ক্রিয়া এই পার্থক্যের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে এই গবেষণায় কোনও নির্দিষ্ট গ্রামের ক্ষেত্রে Glacial Lake Outburst Flood বা GLOF-এর ঝুঁকি নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা হয়নি।
অলকানন্দা অববাহিকায় কমেছে হিমবাহের এলাকা
ওয়াডিয়া ইনস্টিটিউটের প্রবীণ বিজ্ঞানী মনীশ মেহতার মতে, উত্তরাখণ্ডের Upper Alaknanda Basin-এ ১৯৯৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহে ঢাকা এলাকার পরিমাণ ৪.২ ± ২.৯ শতাংশ কমেছে। একই এলাকায় হিমবাহের সামনের প্রান্ত বা snout পিছিয়ে যাওয়ার হার বছরে প্রায় ৯.৩ মিটার থেকে বেড়ে ১৩.৩ মিটার হয়েছে। ১৯৯৪ সালের পর তুষারসীমা বা snowline প্রায় ১০০ মিটার উপরে উঠে গিয়েছে। এ ছাড়া ০.৫ বর্গকিলোমিটারের চেয়ে ছোট হিমবাহগুলির আয়তন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গিয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, ২০০০ সালের পর বেশ কিছু হিমবাহের পিছিয়ে যাওয়ার গতি এবং Equilibrium Line Altitude বা ELA বৃদ্ধির হার বেড়েছে। তবে প্রতিটি হিমবাহের প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। সব মিলিয়ে, উত্তরাখণ্ডের হিমবাহগুলির দ্রুত পশ্চাদপসরণ হিমালয়ের জলবায়ু ও পরিবেশের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বলে মনে করছেন গবেষকরা।


