পাকিস্তানের কূটনৈতিক জুয়া, আমেরিকার সঙ্গে বন্ধুত্বের ফলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর প্রভাব কী? ইসলামাবাদের নতুন বিদেশ নীতির কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোতে কি উদ্বেগ বাড়ছে?

স্বস্তি সচদেব এবং মুগ্ধা সতপুতে

ভারতের ওপর কর বৃদ্ধি-সহ নানা নীতির কারণে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সময়ে, আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু মে ২০২৫ থেকে, পাকিস্তান ও আমেরিকার সম্পর্ক তীব্র উত্থান-পতনের সাক্ষী থেকেছে। এর অনেক কারণ রয়েছে। প্রধানত পাকিস্তানের শক্তি ও তেল ভান্ডারের প্রতি আমেরিকার আগ্রহ, আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটি এবং পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলো এর মধ্যে অন্যতম। মে ২০২৫-এ ভারতের অপারেশন সিন্দুর আক্রমণ এবং সংঘাত হয়েছিল। পাকিস্তান প্রশংসা করে বলেছিল যে এই যুদ্ধবিরতির পিছনে আমেরিকার হাত ছিল। ট্রাম্পের স্বতন্ত্র বিদেশ নীতি এবং ভারতের সঙ্গে আমেরিকার জটিল হতে থাকা সম্পর্ক পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্কে আরও গতি এনেছে।

পাক নেতাদের আমেরিকা সফর

পাকিস্তান ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক যখন ভালো হচ্ছে, তখন পাকিস্তানের নেতারা ওয়াশিংটন সফর করছেন। সেনাপ্রধান আসিম মুনির, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইতিমধ্যেই তিনবার আমেরিকা সফর করেছেন। আমেরিকা বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে। উপরন্তু, ট্রাম্প পরিবারের সদস্যরা সহ-প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে থাকা 'ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিনান্সিয়াল' নামক একটি ফিনটেক কোম্পানি পাকিস্তান ক্রিপ্টো কাউন্সিলের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আমেরিকার শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানের শক্তি ও খনিজ সম্পদে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং দেশটিকে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে অংশীদার হিসেবে দেখছেন। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘাতকে পাকিস্তানের "সামরিক সাফল্য" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত অবস্থানকে তুলে ধরে।

সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য পাকিস্তান দ্রুত এগিয়ে গেলেও, এটি একটি অত্যন্ত কঠিন পথ বেছে নিয়েছে। এটি পশ্চিম এশিয়ার প্রতিবেশী এবং চিনের সঙ্গে সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই দেশগুলোর সঙ্গে ইসলামাবাদের কৌশলগত, আদর্শগত এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং সাম্প্রতিক ঘটনাবলী সেই সম্পর্কগুলোতে সমস্যা তৈরি করতে পারে। যদিও চিনের সঙ্গে আমেরিকার তীব্র মতবিরোধ রয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া ভিন্ন বা নিরপেক্ষ হতে পারে।

পাকিস্তানে চিনের প্রভাব শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, গভীরও। বর্তমানে চিন পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে না। দ্বিপাক্ষিক সফর অব্যাহত থাকায় ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে চিন কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে। আপাতত, আমেরিকা বিএলএ সংগঠনকে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করায় চিনের লাভ হতে পারে, কারণ উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে চিনের বিনিয়োগ এবং নাগরিকরা প্রায়শই এই গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু হতো। একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে, উভয় দেশ এই অঞ্চলে একটি অস্থায়ী শান্তি তৈরি করার লক্ষ্য রাখতে পারে। এছাড়াও, ইসলামাবাদের আমেরিকার সঙ্গে বাড়তে থাকা সম্পর্ক চিনের জন্য হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করার একটি নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে, পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি বাড়াতে সাহায্য করে বা আমেরিকার উপর অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা নির্ভরতা বাড়িয়ে তোলে, তবে চিন অবশ্যই অসন্তুষ্ট হবে।

পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্কের পুনর্গঠনের প্রভাব ভবিষ্যতে জানা যাবে। উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (ইউএই), এটিকে ইরানের প্রভাবের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত "কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি"-র মাধ্যমে পাকিস্তান ও সৌদি আরব তাদের ধর্মীয় ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে। হাউতিদের ক্ষমতা এবং কাতারের উপর সাম্প্রতিক ইজরায়েলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি রিয়াদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক স্বস্তি দেওয়ার পাশাপাশি, আমেরিকার সমর্থনে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সরবরাহকারী হিসেবে তার ভূমিকা বাড়িয়ে তুলবে।

এদিকে, একমাত্র ইরানই পাকিস্তান-আমেরিকা সম্পর্ক নিয়ে তীব্রভাবে উদ্বিগ্ন। আমেরিকা ও তেহরানের মধ্যে খারাপ সম্পর্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আরও তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক পরিকাঠামোর উপর আমেরিকার সাম্প্রতিক বিমান হামলা এর কারণ। পাকিস্তান এই হামলার নিন্দা করলেও, ইরানের সঙ্গে তার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। এই ঘটনাবলী একদিকে আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে, কিন্তু অন্যদিকে ইরানের উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার জন্য পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এটি পাকিস্তান-ইরান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং সীমান্ত এলাকায় আমেরিকার উপস্থিতি বাড়াতে পারে।

আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে তুরস্ক

তুরস্কের জন্যও পাকিস্তান-আমেরিকার এই অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে মে মাসের সংঘাতের সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দিয়ে তার বন্ধুত্বের প্রমাণ দিয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ তুরস্ককে আমেরিকার সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্গঠনের আশা দিয়েছে। ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ত্রিপাক্ষিক সুযোগের পথ তৈরি করতে পারে। সামগ্রিকভাবে, ওয়াশিংটনের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিতে পাকিস্তানের প্রভাব বৃদ্ধি এটিকে ইসলামিক বিশ্ব এবং পশ্চিমা দেশগুলির মধ্যে একটি সেতু হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

এই ধরনের বিদেশ নীতির জুয়া পাকিস্তানের জন্য নতুন কিছু নয়। ভারতের মতোই পাকিস্তানও বিদেশ নীতির বৈপরীত্য এবং বিশ্বব্যাপী ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে লড়াই করেছে। শীতল যুদ্ধের সময় আমেরিকা ও চিন উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখার যে নীতি সে অনুসরণ করেছিল, সেটাই এখন 'নতুন শীতল যুদ্ধ'-এর সময়েও অনুসরণ করতে চাইছে। পাকিস্তানের ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং তার পুরোনো অংশীদারদের কাছ থেকে বাড়তে থাকা ভিসা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে, ইসলামাবাদ তার বহুজাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে আরও বেশি অর্থনৈতিক সাহায্যের আশা করছে। সুতরাং, কিছু দেশের সঙ্গে ছোটখাটো অসুবিধা থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্কগুলো পাকিস্তানের বিশ্বব্যাপী মর্যাদা বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সুযোগ প্রদানে সহায়তা করবে।