নেপালের বিধ্বংসী হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৩৫৫ হয়েছে। এই ঘটনায় সোমবার দেশজুড়ে জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে। রাসুয়া, নুওয়াকোট এবং ধাডিং-এ ব্যাপক উদ্ধারকাজ চলছে, তবে এখনও ৮২ জন নিরাপত্তাকর্মী নিখোঁজ।
নেপালের বিধ্বংসী হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৩৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (NDRRMA) এই নতুন পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
২৬ আগস্টের এই ভয়াবহ বন্যার বলি হওয়া মানুষদের স্মরণে সোমবার দেশজুড়ে জাতীয় শোক পালন করছে নেপাল। ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই জাতীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী, দেশের সমস্ত সরকারি দপ্তর এবং বিদেশের নেপালি দূতাবাসগুলিতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, চলছে উদ্ধারকাজ
ভোটকোশী নদীর বিধ্বংসী বন্যায় রাসুয়া জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। এই বন্যার প্রভাব ত্রিশূলী নদীর পার্শ্ববর্তী নুওয়াকোট এবং ধাডিং-এর মতো এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে বহু মানুষ ঘরছাড়া। পরিবহন, বিদ্যুৎ, জল সরবরাহ এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, সরকারি কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীরা একযোগে উদ্ধারকাজ, ত্রাণ বিতরণ এবং পরিকাঠামো পুনরুদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বয়ানে জেলের রুদ্ধশ্বাস ঘটনা
জাতীয় শোকের আগের দিন, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ একটি বিবৃতিতে ভোটকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা কর্মীদের কাজের প্রশংসা করেন। তিনি নুওয়াকোটের বিদুর-৬-এর খাম্পা ক্যাম্পের সেন্ট্রাল জেলের একটি ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী জানান, বন্যার জল জেলের প্রশাসনিক ভবন এবং আবাসনগুলির নিচতলায় ঢুকে পড়েছিল। সেই সময় নেপাল পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ফোর্সের (APF) ৫২ জন কর্মী ঝুঁকি নিয়ে ৯২৩ জন বন্দিকে জেলের উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যান।
এই ডামাডোলের মধ্যে ৫০ জন বন্দি ভাঙা পাঁচিল দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে, তাঁদের ফের ধরে ফেলা হয়। এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন অফিসার আহতও হন। প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, কাছাকাছি ব্যারাক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং জল সরবরাহ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তাকর্মীরা জেলের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রেখেছেন।
দেশজুড়ে উদ্ধার ১৩ হাজারের বেশি মানুষ
দেশজুড়ে নেপালি সেনা, নেপাল পুলিশ এবং এপিএফ-এর যৌথ অভিযানে আকাশ ও স্থলপথে মোট ১৩,৩৯১ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে বাত্তার ও ধুনচেতে নেপালি সেনার ৯,২৮৭ জন কর্মী কাজ করছেন এবং দেবীঘাটে অস্থায়ী সেতু তৈরি করছেন। নেপাল পুলিশের ৭,৯৭৫ জন অফিসার একেবারে সামনে থেকে উদ্ধারকাজ, মৃতদেহ উদ্ধার এবং ডগ স্কোয়াড পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া, এপিএফ-এর ৪,২০৩ জন কর্মী ১৩টি রেসপন্স বেস থেকে ডাইভিং ইউনিট, রোপ রেসকিউ টিম এবং ড্রোনের সাহায্যে নজরদারি চালাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন যে, এই বন্যায় এখনও পর্যন্ত ৮২ জন নিরাপত্তাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জন নেপালি সেনা, ২৫ জন নেপাল পুলিশ এবং ১২ জন এপিএফ-এর সদস্য। শাহ উদ্ধারকাজে নিযুক্ত নিরাপত্তাকর্মী, তাঁদের পরিবার এবং সহায়তাকারী বিশেষজ্ঞদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
'কর্মজীবনে এমন চ্যালেঞ্জ দেখিনি', বলছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ
এই পরিস্থিতিতে আসরে নেমেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অস্ট্রেলিয়ান টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্স। ২০২৩ সালে ভারতের সিল্কিয়ারা টানেল থেকে ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধারের ঘটনায় তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন। নেপালের এই বন্যা পরিস্থিতিকে তিনি তাঁর কর্মজীবনের 'সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ' বলে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার ভোটকোশী নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ডিক্স সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, "এই মুহূর্তে নেপালে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, যা আমি আগে কখনও দেখিনি। এটা একটা উদ্ধারকাজ নয়, বরং একই সময়ে বিভিন্ন জায়গায় একাধিক সম্ভাব্য উদ্ধারকাজ চলছে। প্রত্যেকটির বিপদ, অনিশ্চয়তা এবং বাঁচার আশা আলাদা।"
সিল্কিয়ারার অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে একটিমাত্র জটিল উদ্ধারকাজে ৪১ জনকে বাঁচানো গিয়েছিল। কিন্তু ভোটকোশীর কাছে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একই সঙ্গে একাধিক সংকটজনক এলাকা সামলাতে হচ্ছে।
ডিক্স তাঁর পোস্টে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে লেখেন, "এশিয়ার ঐতিহ্য আমাদের এক শক্তিশালী ধারণা দেয়: ধর্ম। আসল পরীক্ষা এটা নয় যে আমরা সফল হব কি না। আসল পরীক্ষা হল, যখন পথ কঠিন হয়, দায়িত্ব বেড়ে যায় এবং ফলাফল অজানা থাকে, তখনও আমরা সঠিক কাজ করে যেতে পারি কি না।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সিল্কিয়ারা আমাকে শিখিয়েছিল অসম্ভব বলে কিছু হয় না। নেপাল আমাকে আরও বেশি কিছু শেখাচ্ছে: যখন একাধিক জীবন আমাদের উপর নির্ভরশীল, তখন আশাকে শৃঙ্খলায়, সহানুভূতিকে কাজে পরিণত করতে হয় এবং কর্তব্যের জন্য সাফল্যের নিশ্চয়তার অপেক্ষা করা যায় না।" বর্তমানে বিশেষজ্ঞ দলগুলি দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর জন্য প্রবল স্রোত এবং ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
টানেল পরিষ্কার ও ডিএনএ পরীক্ষায় ভারতের সাহায্য
এদিকে, উদ্ধারকাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে ভারতও। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) জানিয়েছে যে, একটি ভারতীয় টেকনিক্যাল দল চিলিমে টানেল পরিষ্কার করার কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছানোর জন্য প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অস্থায়ী রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে, একটি ভারতীয় ফরেনসিক দল কাঠমান্ডুর দুটি ল্যাবে ৪০০-র বেশি ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করেছে এবং ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০টি ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করেছে বলে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।
বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নতুন নিয়ম
এই পরিস্থিতিতে নেপাল সরকার বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নতুন নিয়ম জারি করেছে। একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে ভোটকোশী এবং ত্রিশূলী নদীর বন্যা কবলিত এলাকা থেকে খবর সংগ্রহ করতে হলে বিদেশি সাংবাদিকদের নেপালের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ (DoIB) থেকে প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন এবং সাংবাদিক পরিচয়পত্র নিতে হবে।
গোর্খা জেলায় নতুন বন্যার সতর্কতা
এরই মধ্যে গোর্খা জেলার পার্বত্য অঞ্চলে নতুন করে বন্যার পর বুধিগণ্ডকী নদীর অববাহিকায় সতর্কতা জারি করেছে নেপালের প্রশাসন। গোর্খা জেলার চুমানুব্রি গ্রামীণ পৌরসভার ৪ এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়া থেরাং নদীতে বন্যার কারণেই এই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার সকালের এই বন্যায় চারটি বাড়ি এবং একটি ঝুলন্ত সেতু ভেসে গেছে। এর ফলে মানাসলু অঞ্চলে ট্রেকিং করতে আসা পর্যটকদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


